আগরতলা, ১০ সেপ্টেম্বর: “বিদ্যুৎ ছাড়া রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ দরকার, হাসপাতালের জন্য বিদ্যুৎ দরকার, শিক্ষাক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ প্রয়োজন—সবকিছুর জন্যই বিদ্যুৎ অপরিহার্য।” রাজ্যের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে এমনটাই বললেন বিদ্যুৎমন্ত্রী রতনলাল নাথ। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, রাজ্যে বর্তমানে আর কোনও লোডশেডিং নেই, মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে লোডশেডিংয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
বৃহস্পতিবার আগরতলার একটি পাঁচতারা হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হল ‘ত্রিপুরা ক্লিন এনার্জি রোডম্যাপ ২০৩৫’, গ্রিন স্কিলিং প্রোগ্রাম ‘উন্নয়ন’ এবং ‘ট্রান্সফর্মিং রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাক্সিলারেশন ইন ত্রিপুরা ’ কর্মসূচি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সহযোগিতায় রাজ্যের নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রসারে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রতনলাল নাথ বলেন, পরিচ্ছন্ন শক্তির পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি। এই কর্মসূচির আওতায় এক হাজারেরও বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণের আওতায় থাকবেন আইটিআই উত্তীর্ণ, দ্বাদশ শ্রেণি পাস যুবক-যুবতী, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রযুক্তিবিদরা।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শুধু সৌর প্যানেল বসালেই হবে না। প্যানেলগুলি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষেবা দেবে কারা, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। তাই নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগতভাবে প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন বাড়বে।
গত আট বছরে ত্রিপুরায় দ্রুত উন্নয়নের ফলে দক্ষ কর্মীর চাহিদাও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন রতনলাল নাথ। তাঁর কথায়, তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে, নইলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
রাজ্যের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, ত্রিপুরা বর্তমানে প্রতিবেশী বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। একই সঙ্গে রাজ্যে বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি নেই বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, “এখন আর লোডশেডিং নেই।” তবে কোথাও কোথাও যে সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়, সেটিকে লোডশেডিং বলা ঠিক নয় বলে জানান তিনি।
বিদ্যুৎ পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে বড় প্রকল্পের কথাও ঘোষণা করেন মন্ত্রী। আগরতলা পুরনিগম এলাকার সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ধাপে ধাপে ভূগর্ভস্থ করা হবে। এই প্রকল্পে আনুমানিক ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হবে। রতনলাল নাথ জানান, প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে এবং কাজের বরাতও দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন পর্ব শেষ হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. মানিক সাহার উপস্থিতিতে ভূমিপুজোর মাধ্যমে শীঘ্রই কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।
এদিন এডিবির প্রিন্সিপাল এনার্জি স্পেশালিস্ট জেমস কোলান্থারাজ বলেন, ‘ক্লিন এনার্জি রোডম্যাপ ২০৩৫’ শুধুমাত্র একটি সমীক্ষা বা রিপোর্ট নয়। এটি নবায়নযোগ্য শক্তির বিকাশ, শক্তি নিরাপত্তা এবং সবুজ কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে একটি বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করবে।
তিনি জানান, ২০২৩ সালে ত্রিপুরা সরকার এবং ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন লিমিটেডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে এই রোডম্যাপ তৈরির কাজ শুরু করে এডিবি। পরিচ্ছন্ন শক্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় যুবসমাজ, মহিলা, কৃষক, উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে যুক্ত করে মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে টিএসইসিএল -এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর বিশ্বজিৎ বসু জানান, বর্তমানে ত্রিপুরায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৩৮০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে প্রায় ১৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ৬০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫২০ মেগাওয়াট এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা প্রায় ৮০০ মেগাওয়াটে পৌঁছতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।
পরিচ্ছন্ন শক্তির লক্ষ্যে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণ, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির পুনর্বাসন, হাইড্রোকাইনেটিক প্রকল্প, ৮০০ মেগাওয়াটের হাইড্রো পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্প, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর পাশাপাশি আগরতলার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তরের কাজ চলছে। এর আওতায় ভূগর্ভস্থ উচ্চ ও নিম্ন ভোল্টেজ কেবল, জিআইএস সাবস্টেশন, এসসিএডিএ ও এডিএমএস-সমন্বিত স্মার্ট গ্রিড নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এবং ভূগর্ভস্থ অপটিক্যাল ফাইবার যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গ্রিন স্কিলিং প্রোগ্রাম ‘উন্নয়ন’-এর মাধ্যমে যুবক-যুবতী ও মহিলাদের সবুজ কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলার ওপর জোর দেওয়া হবে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের বিভিন্ন আধুনিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে সফল অংশগ্রহণকারীদের ভারত সরকারের স্বীকৃত সংস্থার মাধ্যমে মূল্যায়ন ও শংসাপত্র প্রদান করা হবে।
অনুষ্ঠানে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজের জন্য পিএম – এসজিএমবিওয়াই এবং পিএম-কুসুম -এর আওতায় তিনটি করে সংস্থাকে সম্মানিত করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ দফতরের সচিব অভিষেক সিং, অর্থ দফতরের সচিব পি. কে. গোয়েল, ত্রিপুরা রুরাল লাইভলিহুড মিশনের সিইও তড়িৎ কান্তি চাকমা, স্কিল ডেভেলপমেন্টের অধিকর্তা, এডিবি, টিএসইসিএল, টিপিজিএল, টিপিটিএল, টিআরইডিএ -সহ বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার আধিকারিকরা।
———–



















