আগরতলা, ৩০ আগস্ট: বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ত্রিপুরায় ফিরলেন সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব। রবিবার আগরতলা এমবিবি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার দলীয় কর্মী-সমর্থক। বিমানবন্দর থেকে সস্ত্রীক হুডখোলা গাড়িতে করে শহরে পৌঁছে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে আয়োজিত অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন সভায় যোগ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. মানিক সাহা, বিজেপির ত্রিপুরা প্রদেশ সভাপতি অভিষেক দেবরায়, রাজ্যসভার সাংসদ তথা প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিধায়ক, দলের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব এবং বিপুল সংখ্যক দলীয় কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
এদিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিপ্লব কুমার দেব তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ত্রিপুরার মানুষের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ত্রিপুরার মাটি তাঁকে অনেক কিছু দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী, বিধায়ক, রাজ্যসভার সাংসদ, লোকসভার সাংসদ থেকে শুরু করে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব—সবকিছুর পেছনে ত্রিপুরার মানুষ ও বিজেপির কার্যকর্তাদের অবদান রয়েছে।
সাংসদ বলেন, তিনি কখনও ভাবেননি যে রাজনীতিতে এসে মুখ্যমন্ত্রী বা সাংসদ হওয়ার পাশাপাশি একদিন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তৃণমূল স্তর থেকে বিজেপির কার্যকর্তাদের পরিশ্রম এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই ত্রিপুরায় বিজেপির উত্থান সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার গঠনের পর তার প্রভাব ত্রিপুরাতেও পড়ে। এর ফলেই ২০১৮ সালে ত্রিপুরায় শূন্য থেকে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। উন্নয়ন, পরিকাঠামো, যুব সমাজ ও সাধারণ মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখে রাজনীতির নতুন ধারা তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিন দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দেন বিপ্লব দেব। তিনি প্রত্যেক বিজেপি কার্যকর্তাকে নিয়মিত মানুষের বাড়িতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর আহ্বান, প্রতিদিন অন্তত পাঁচটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের খোঁজখবর নিতে হবে। কার বাড়িতে যাওয়া হয়েছে, তাঁদের মোবাইল নম্বর এবং কী সমস্যা রয়েছে—সেগুলি ডায়েরিতে নথিভুক্ত করার পরামর্শও দেন তিনি।
বিপ্লব দেব বলেন, মানুষের সুখ-দুঃখের কথা জানতে পারলেই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যায়। তাঁর মতে, জনপ্রতিনিধি বা দলীয় কর্মীদের মানুষের কাছাকাছি থাকতে হবে। ভয় নয়, মানুষের কাছ থেকে সম্মান ও আশীর্বাদ পাওয়াই একজন প্রকৃত কর্মীর সাফল্যের পরিচয়।
তিনি আরও বলেন, দলের প্রাক্তন পদাধিকারীদেরও কোনওভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। বরং একজন প্রাক্তন সভাপতি বা প্রাক্তন পদাধিকারীর অভিজ্ঞতাকে দলের সম্পদ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। তৃণমূল স্তরের কর্মীদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কর্মীদের আত্মবিশ্বাসী হতে হবে এই এবং নিজেদের সামর্থ্যের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।
ত্রিপুরায় রাজনৈতিক হিংসার প্রসঙ্গও এদিন তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। অতীতে রাজনৈতিক আন্দোলনে নিহত বিজেপি কর্মীদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের রাজনীতি থেকে ত্রিপুরা বর্তমানে মুক্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন বিপ্লব দেব।
দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘‘নিজেকে আগে চিনতে হবে।’’ তাঁর কথায়, প্রত্যেক কর্মীর মধ্যেই নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একজন সাধারণ কার্যকর্তাও ভবিষ্যতে বড় দায়িত্ব পেতে পারেন। তাই কাউকে নিজেকে ছোট করে দেখা উচিত নয়।
বক্তব্যের শেষপর্বে বিপ্লব দেব কর্মীদের বিনয়ী ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গাছ যত বড় হয়, তত বেশি ফল ধরে এবং ফল ধরলে গাছ আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে। তেমনই জীবনে যত সাফল্য আসবে, তত বেশি বিনয়ী হতে হবে—তবেই প্রকৃত অর্থে মানুষের ভালোবাসা ও আশীর্বাদ পাওয়া সম্ভব।
এদিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিপ্লব কুমার দেবের নিযুক্তিকে ত্রিপুরার জন্য গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. মানিক সাহা। তাঁর কথায়, তৃণমূল স্তরের একজন কার্যকর্তা থেকে বিপ্লব দেবের সর্বভারতীয় স্তরে এই দায়িত্বে পৌঁছনো দলের জন্য অত্যন্ত আনন্দের।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০১৫ সালে বিপ্লব দেব ত্রিপুরায় আসার পর থেকেই দলীয় কার্যকর্তাদের কীভাবে দায়িত্ব দিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। সেই সময় রাজ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা ছিল, বিজেপির সংগঠন বিস্তারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে বলে দাবি করেন তিনি।
বিজেপির সাংগঠনিক সংস্কৃতির প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দলের কার্যকর্তাদের কাজের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে ত্রিপুরায় বিজেপির প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিন বিরোধী দলকে আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে একটি শক্তিশালী ও গঠনমূলক বিরোধী দল থাকা প্রয়োজন। তবে বিরোধীদের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে নিজেদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে ভাবতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বিজেপি সরকার মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে ‘হিউম্যান টাচ’-এর উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খেলোয়াড়দের সম্মান জানাতে ক্রীড়া পরিকাঠামোর সঙ্গে তাঁদের নাম যুক্ত করা এবং জিবি হাসপাতালের সামনে সাধারণ মানুষের জন্য শেল্টার হাউস ও ক্যান্টিনের মতো উদ্যোগ তারই উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিপ্লব দেবের সর্বভারতীয় দায়িত্ব প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে ত্রিপুরার বিজেপি কর্মীদের মধ্যে নতুন উৎসাহ তৈরি হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর আশা, আগামী দিনে ত্রিপুরার সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে এবং রাজ্যের মানুষের উন্নয়নে বিজেপি সরকার আরও কাজ করবে।
এছাড়াও এই দিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রদেশ বিজেপির সভাপতি অভিষেক দেবরায় ও সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য বিপ্লব কুমার দেবকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। পাশাপাশি সর্বভারতীয় স্তরে বিপ্লব কুমার দেবের এই সাফল্যের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব কে সর্বভারতীয় স্তরে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে দল আগামী দিনে আরো এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।



















