নয়াদিল্লি, ৩০ আগস্ট (আইএএনএস): বাংলার কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো থেকে শুরু করে নারী ক্ষমতায়ন, স্থানীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে জীবিকা তৈরি এবং নতুন ধরনের কৃষি চাষ—রবিবার ‘মন কি বাত’-এর ১৩৭তম পর্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের একাধিক অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগের কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
আগামী ৩ সেপ্টেম্বর উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ পালিত হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ‘বহুমুখী প্রতিভার অভিনেতা’ হিসেবে স্মরণ করেন। তাঁর অভিনয় তাঁকে মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল বলে মন্তব্য করেন মোদি। অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় নামে জন্ম নেওয়া উত্তম কুমার বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মহানায়ক’ হিসেবে পরিচিত। তিন দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয় জীবনে তিনি ২৫০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেন।
উত্তম কুমারের সঙ্গে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে প্রচলিত ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সত্যজিৎ রায় ‘নায়ক’ ছবির চিত্রনাট্য উত্তম কুমারকে মাথায় রেখেই লিখেছিলেন বলে মনে করা হয়। রায় উত্তম কুমারের অভিনয়ে অসাধারণ আবেগের গভীরতা ও ব্যক্তিত্বের মর্যাদা লক্ষ্য করেছিলেন বলেও মোদি উল্লেখ করেন।
উত্তম কুমারের স্বাভাবিক অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর সমাজসেবামূলক কাজেরও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। জীবনের শুরুর দিকে বেশ কিছু ছবি সফল না হলেও তিনি কাজ থেকে সরে যাননি। তাঁর অধ্যবসায়ই পরবর্তীতে তাঁকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয় বলে মন্তব্য করেন মোদি।
কলকাতায় একটি রোড শো করার সময় উত্তম কুমারের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার স্মৃতিও শ্রোতাদের সঙ্গে ভাগ করে নেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সময় কেউ তাঁকে উত্তম কুমারের একটি ছবি উপহার দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। কিংবদন্তি অভিনেতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মোদি বলেন, উত্তম কুমার চিরকাল মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
‘মন কি বাত’-এ প্রধানমন্ত্রী নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও ‘পিএম স্বনিধি’ প্রকল্পের ভূমিকা তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের প্রায় ৪৬ শতাংশই মহিলা। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁদের ছোট ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন।
মোদি বলেন, শহর ও মফস্বলের রাস্তায় বহু মহিলা সবজি, ফল, ফুল, মাটির প্রদীপ, পুজোর সামগ্রী কিংবা চায়ের দোকানের মতো ছোট ব্যবসা পরিচালনা করেন। অনেক ক্ষেত্রে মূলধনের অভাব তাঁদের ব্যবসা বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ‘পিএম স্বনিধি’ সেই সমস্যার মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা দিয়ে বহু মহিলাকে নতুন শক্তি দিয়েছে বলে জানান তিনি।
গাজিয়াবাদের বাবিতা শর্মার উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি আগে ফুল, মাটির প্রদীপ, ধূপকাঠি ও নারকেলের মতো পুজোর সামগ্রী নিয়ে রাস্তার ধারে ছোট দোকান চালাতেন। ‘পিএম স্বনিধি’-র আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পর তিনি পণ্যের মজুত বাড়ান, ব্যবসা সম্প্রসারিত করেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর ছোট দোকান একটি স্থায়ী দোকানে পরিণত হয়। এর ফলে তাঁর ক্রেতা এবং আয় দু’টিই বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেঙ্গালুরুর টি.এস. নিঙ্গাম্মার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ও তাঁর স্বামী ইডলি, দোসা ও সাম্বারের ছোট ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ‘পিএম স্বনিধি’-র সহায়তায় নিঙ্গাম্মা তাঁর ব্যবসার গাড়ি উন্নত করেন, পাইকারি হারে সামগ্রী কিনতে শুরু করেন এবং মেনুতে নতুন খাবার যোগ করেন। ক্রেতা ও আয় বাড়ার সঙ্গে পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে তিনি তাঁর তিন সন্তানের আরও ভালো শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারছেন বলে জানান মোদি।
একজন মহিলার ব্যবসার উন্নতি শুধু তাঁর নিজের জীবন নয়, গোটা পরিবারের ভবিষ্যৎকে এগিয়ে দেয় বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। সন্তানদের ভালো শিক্ষা, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো এবং মহিলার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থানীয় উদ্যোগ কীভাবে জীবিকার নতুন পথ খুলে দিচ্ছে, সেই প্রসঙ্গে নাগাল্যান্ডের ফেক জেলার ভেসালু পুরোর উদাহরণ তুলে ধরেন মোদি।
কৃষক পরিবারে বড় হওয়া ভেসালুর ছোটবেলা থেকেই ফুলের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। ২০২১ সালে অল্প পরিসরে ফুল চাষ শুরু করেন তিনি। পরে বিয়ে, উৎসবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফুলের ক্রমাগত চাহিদা দেখে এটিকে বাণিজ্যিকভাবে করার সিদ্ধান্ত নেন।
স্থানীয় কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র থেকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফুল চাষের প্রশিক্ষণ নিয়ে মাত্র এক-চতুর্থাংশ একর জমিতে হাজার হাজার গ্ল্যাডিওলাসের কন্দ রোপণ করেন ভেসালু। প্রথমবারেই ৫ হাজারেরও বেশি ফুল ফোটে। সেই সাফল্য তাঁকে আরও বড় পরিসরে ফুল চাষে উৎসাহিত করে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, একসময় যে ফুল স্থানীয় বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত, এখন নাগাল্যান্ড থেকে দিল্লি ও মুম্বইয়ের মতো শহরেও পৌঁছে যাচ্ছে। তাঁর মতে, শখের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক প্রশিক্ষণ যুক্ত হলে তা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
ওড়িশার দেব্রিগড় এলাকার ঢোদ্রোকুসুম গ্রামের মৈথিলি ভূয়ের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। আগে তিনি প্রায় প্রতিদিন জঙ্গলে যেতেন জ্বালানি কাঠ, মহুয়া ফুল, কেন্দ্রু পাতা, বাঁশের কঞ্চি ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতে।
পরবর্তীতে দেব্রিগড় ইকো-ট্যুরিজমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর বন ব্যবহারের ধরনে পরিবর্তন আসে। বন সংরক্ষণই ধীরে ধীরে তাঁর জীবিকার অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে। তাঁর উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার আরও বহু মহিলা বন সংরক্ষণে যুক্ত হন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ৬০-এর বেশি মহিলা সক্রিয়ভাবে বন সংরক্ষণে কাজ করছেন। কেউ বন্যপ্রাণী রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন, কেউ তৃণভূমি উন্নয়নে যুক্ত, আবার কেউ ইকো-ট্যুরিজমের বিভিন্ন কাজে অংশ নিচ্ছেন।
প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি একইসঙ্গে সম্ভব—মৈথিলি ও দেব্রিগড়ের মহিলারা তার উদাহরণ তৈরি করেছেন বলে মন্তব্য করেন মোদি।
অ্যাভোকাডো চাষে বাড়ছে কৃষকদের আয়
নতুন ফসল গ্রহণের মাধ্যমে কৃষকরা কীভাবে আয়ের নতুন উৎস তৈরি করছেন, সেই প্রসঙ্গে অ্যাভোকাডো চাষের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। একসময় দেশে এই ফলের পরিচিতি ও চাহিদা কম থাকলেও বর্তমানে স্বাস্থ্য ও প্রিমিয়াম বাজারে অ্যাভোকাডোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্ধ্রপ্রদেশের কডাপ্পার বরদরাজের উদাহরণ দিয়ে মোদি জানান, তিনি দীর্ঘদিন টমেটো ও কলা চাষ করতেন। এক বন্ধুর খামারে অ্যাভোকাডো চাষ দেখে তিনিও এই ফসল চাষ শুরু করেন। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৪ টন অ্যাভোকাডো উৎপাদন করেছেন তিনি এবং বর্তমানে স্থানীয় দোকানে সরাসরি তা সরবরাহ করছেন। নতুন ফসল, বৈজ্ঞানিক পরামর্শ ও সরাসরি বিপণন তাঁর ছোট খামারের আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তামিলনাড়ুর কোডাইকানালের কৃষক চন্দ্রশেখরনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। আধা হেক্টর জমিতে অ্যাভোকাডো চাষ শুরু করে ভালো দাম পাওয়ায় তাঁর আয় বেড়েছে।
কর্ণাটকের চিক্কামাগালুরুতে কয়েকজন কৃষক কফি বাগানের মধ্যেও অ্যাভোকাডো গাছ লাগিয়েছেন বলে জানান মোদি। এর ফলে কফি ও গোলমরিচের পাশাপাশি অ্যাভোকাডো থেকেও অতিরিক্ত আয় হচ্ছে।
অ্যাভোকাডোকে কেন্দ্র করে শহুরে খাদ্যসংস্কৃতির উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রেস্তোরাঁয় অ্যাভোকাডো টোস্ট যেমন জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনই দেশের উদ্ভাবনী কৃষকদের কাছে এই ফল হয়ে উঠেছে নতুন আয়ের ‘রেসিপি’।
‘মন কি বাত’-এর এই পর্বে প্রধানমন্ত্রী মূলত দেখাতে চেয়েছেন, সরকারি প্রকল্প, ব্যক্তিগত আগ্রহ, স্থানীয় সম্পদ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষিতে বৈচিত্র্য—সঠিক উদ্যোগ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এগুলিই কীভাবে নতুন জীবিকা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। —আইএএনএস



















