নয়াদিল্লি, ২১ আগস্ট(আইএএনএস) : দেশে সাম্প্রতিক চিনি দামের বৃদ্ধির সঙ্গে ইথানল উৎপাদনের জন্য চিনি সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে সরাসরি যুক্ত করা ঠিক নয় বলে জানাল কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার কেন্দ্রের বক্তব্য, ইথানল তৈরির জন্য সরানো চিনির পরিমাণ বরং গত কয়েক বছরে কমেছে। ২০২২-২৩ সালে মোট উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ চিনি ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করা হলেও ২০২৫-২৬ সালে তা কমে প্রায় ৯ শতাংশ হয়েছে।
ভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, দেশে উৎপাদিত ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এখন শস্য, বিশেষ করে ভুট্টা থেকে তৈরি হচ্ছে। ফলে চিনির দাম বৃদ্ধির জন্য ইথানল উৎপাদনকে দায়ী করা সঠিক নয় বলে সরকারের দাবি।
সরকার জানিয়েছে, চিনি বাজারের পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত চিনি সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে চিনির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০ জুলাই প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৪৮.১৮ টাকা। ২০ আগস্ট তা বেড়ে হয়েছে ৫৫.৭০ টাকা।
মন্ত্রকের বক্তব্য, চিনি দামের বর্তমান বৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় কম দেশীয় উৎপাদন, উৎসবের মরশুমের আগে চাহিদা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার কারণে আখের ক্ষতি, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির সরবরাহ কমে যাওয়া এবং শিল্পের কিছু অংশের মজুতদারি ও জল্পনা এর অন্যতম কারণ।
চলতি মরশুমে দেশে চিনি উৎপাদন প্রায় ৩০৬ লক্ষ মেট্রিক টন হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অথচ আখ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী উৎপাদনের সম্ভাব্য পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৪৩ লক্ষ মেট্রিক টন।
আখের ফলনে রেড রট ও টপ বোরার রোগের প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে জল জমে যাওয়াতেও আখের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রক।
তবে উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় কম হলেও দেশে পর্যাপ্ত চিনির মজুত রয়েছে বলে সরকারের দাবি। অক্টোবর মাসে নতুন করে আখ মাড়াইয়ের মরশুম শুরু হওয়া পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো চিনি দেশে রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
শুধু ভারত নয়, বিশ্বজুড়েই চিনির সরবরাহে টান তৈরি হয়েছে। ২০২৬-২৭ সালে বিশ্ব বাজারে চিনির ঘাটতি প্রায় ৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কাও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিকে আরও প্রভাবিত করেছে।
সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ছিল প্রতি টন ৪৭৪ ডলার। ২০ আগস্ট তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫২ ডলারে। অর্থাৎ দুই মাসেরও কম সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ১৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
ভারতে সাধারণত বছরে প্রায় ৩২০-৩৪০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৮০-২৯০ লক্ষ মেট্রিক টন। উৎপাদন উদ্বৃত্ত হলে চিনি কারখানাগুলিতে অতিরিক্ত মজুত পড়ে থাকে, ফলে কারখানাগুলির অর্থ আটকে যায় এবং আখচাষিদের পাওনা মেটাতেও দেরি হতে পারে।
এই কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলায় উদ্বৃত্ত চিনি ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে সরকার। এর ফলে চিনি কারখানাগুলির আর্থিক অবস্থার উন্নতিও হয়েছে বলে দাবি কেন্দ্রের।
সরকার জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ মরশুমের আখচাষিদের পাওনার ৯৭ শতাংশই ২০ আগস্ট পর্যন্ত মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিনি কারখানাগুলির আর্থিক অবস্থার উন্নতির ফলে সরকারি সহায়তার উপর তাদের নির্ভরতাও কমেছে।
২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে চিনি শিল্পকে প্রায় ১৪,৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২১-২২ সালের পর থেকে এই খাতে নতুন করে কোনও ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়নি বলে জানিয়েছে সরকার।
দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের জন্য চিনির দামও মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল বলে মন্ত্রকের দাবি। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত চিনির দাম বছরে গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে।
এদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মজুত রুখতে ব্যবসায়ীদের জন্য চিনির মজুতের সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেশজুড়ে চিনি ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ ৪০০ টন পর্যন্ত মজুত রাখার অনুমতি রয়েছে। পাশাপাশি ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাল্ক ক্রেতারা ১৫ দিনের ব্যবহারের বেশি চিনি মজুত রাখতে পারবেন না।
























