ওয়াশিংটন, ৫ জুলাই: যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে দেশের ইতিহাস, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের রূপরেখা তুলে ধরলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি কঠোর নির্বাচনী আইন, কমিউনিজমের বিরোধিতা এবং মহাকাশ গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতির উপরও জোর দেন।
বজ্রবিদ্যুৎ-সহ প্রবল ঝড়ের কারণে কয়েক ঘণ্টা অনুষ্ঠান পিছিয়ে যাওয়ার পর ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে সমবেত সমর্থকদের উদ্দেশে প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণ দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আমাদের নিরুৎসাহিত করার কোনও উপায় ছিল না। আপনারা বিশেষ মানুষ, আর আমাদের দেশও বিশেষ।”
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ২৫০ বছর পূর্তিকে তিনি আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় মাইলফলক বলে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প বলেন, “গত ২৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাসীর কাছে আশা, প্রতিশ্রুতি, আলোর দিশা এবং গৌরবের প্রতীক। সবাই আমাদের মতো হতে চায়, কিন্তু কেউ আমাদের মতো হতে পারে না।”
ভাষণে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা, সংবিধান প্রণয়ন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, শিল্পায়ন, দুই বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ এবং মহাকাশ অভিযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলির কথা তুলে ধরেন। মার্কিন সংবিধানকে তিনি “এ পর্যন্ত রচিত সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক দলিল” বলে বর্ণনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুদ্ধের স্মৃতিবাহী মার্কিন পতাকা প্রদর্শনের পাশাপাশি যুদ্ধবীর ও ‘মেডেল অব অনার’ প্রাপকদেরও সম্মান জানানো হয়। ট্রাম্প তাঁদের “আমেরিকার সাহসিকতার প্রতীক” বলে অভিহিত করেন।
ভাষণের বড় অংশ জুড়েই ছিল সামরিক শক্তির প্রসঙ্গ। ট্রাম্প দাবি করেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও দমকল বাহিনীতে নিয়োগ বেড়েছে, কারণ মানুষ আবার দেশকে ভালোবাসছে ও সম্মান করছে। তিনি বলেন, তাঁর প্রথম মেয়াদে মার্কিন সেনাবাহিনীকে নতুনভাবে শক্তিশালী করা হয়েছিল।
ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, চলতি বছরের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করেছে। এমনকি তিনি আরও দাবি করেন, “আমরা ইতিহাসের অন্যতম বড় নৌ-জয় অর্জন করেছি। ইরানের পুরো নৌবহর, ১৫৯টি জাহাজ সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছি।”
তিনি বলেন, “আমেরিকা বিজয়ীদের দেশ, আর আজ আমাদের দেশ আবার জয়ী হচ্ছে।”
নির্বাচনী সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প কংগ্রেসকে ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ অনুমোদনের আহ্বান জানান। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, ভোট দিতে বাধ্যতামূলক পরিচয়পত্র ও নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে হবে এবং অসুস্থতা, প্রতিবন্ধকতা, সামরিক দায়িত্ব বা ভ্রমণের বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া ডাকযোগে ভোট দেওয়া যাবে না।
ভাষণে একাধিকবার কমিউনিজমের কড়া সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, “আমরা আমাদের দেশে কমিউনিস্ট চাই না। আমেরিকা কখনও কমিউনিস্ট দেশ হবে না। কমিউনিজম একটি ব্যর্থ মতাদর্শ এবং এটি শুরু হওয়ার আগেই থামানো উচিত।”
মহাকাশ গবেষণার প্রসঙ্গেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। নাসার আর্টেমিস-২ অভিযানের নভোচারী এবং অ্যাপোলো-১৭ অভিযানের মহাকাশচারী জ্যাক শ্মিটকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমরা আবার চাঁদে যাব, তারপর মঙ্গল গ্রহেও পৌঁছব।”
তিনি আরও দাবি করেন, মার্কিন স্পেস ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্তকে একসময় সমালোচনা করা হলেও বর্তমানে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র চীন ও রাশিয়ার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সামরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সেনাদের ১১টি ‘গোল্ড স্টার’ পরিবারের সদস্যদেরও সম্মান জানান ট্রাম্প।
অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মার্কিন শেয়ারবাজার ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে, দেশে ১৯.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে, নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠছে, কর্মসংস্থান ও অবসরকালীন সঞ্চয়ও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাঁর দাবি, ওয়াশিংটনও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ ও সুন্দর।
ভাষণের শেষে ট্রাম্প বলেন, “আমরা বিশ্বের প্রাচীনতম সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রগুলির একটি হলেও আমাদের যাত্রা মাত্র শুরু হয়েছে। সেরাটা এখনও আসা বাকি।” তিনি বর্তমান সময়কে “আমেরিকার স্বর্ণযুগ” বলে উল্লেখ করে দেশকে আরও বড়, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করে তোলার অঙ্গীকার করেন।
ভাষণ শেষে ন্যাশনাল মলে বর্ণাঢ্য আতশবাজির প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
সূত্র: আইএএনএস



















