নয়াদিল্লি, ২৬ জুন (আইএএনএস) : আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে শুক্রবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নারকোটিক্স কো-অর্ডিনেশন (এনসিওআরডি)-এর ১০ম শীর্ষস্তরের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এদিন তিনি দেশকে মাদকের অভিশাপ থেকে রক্ষার লক্ষ্যে প্রণীত ‘ভিশন ডকুমেন্ট অন নারকোটিক্স কন্ট্রোল’-এরও উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমিত শাহ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ভারতের লড়াই এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং আগামী তিন বছর এই অভিযানকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তিনি বলেন, ২৬ জুন ভারতের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। একদিকে দেশ যখন মাদকবিরোধী কার্যকর রূপরেখা তৈরি করছে, অন্যদিকে এদিনই প্রখ্যাত সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী। তাঁর কথায়, ব্রিটিশ শাসনামলে বঙ্কিমচন্দ্র দেশের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং ভারতকে ‘বন্দে মাতরম’-এর মতো অমর সৃষ্টি উপহার দিয়েছিলেন।
অমিত শাহ বলেন, বন্দে মাতরম শুধুমাত্র একটি স্লোগান বা গান নয়, এটি ভারতের সাংস্কৃতিক চেতনা, দেশপ্রেম এবং জাতীয় পুনর্গঠনের মন্ত্র। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ও এটি ছিল আন্দোলনের মূলমন্ত্র। ইতিহাস সাক্ষী, বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে শেষবার ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ করেছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদক সমস্যা শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। আগামী ১০০ বছরের ভারতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে সরকার, বিভিন্ন দফতর, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ, যুবসমাজ এবং মহিলাদের একযোগে মাদকবিরোধী আন্দোলনে শামিল হতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মাদকবিরোধী অভিযান সফল করা সম্ভব নয়।
অমিত শাহ দেশের সমস্ত রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং পুলিশ মহাপরিচালকদের (ডিজিপি) উদ্দেশে বলেন, এনসিওআরডি পোর্টালের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলিকে যেন শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা না হয়। বরং সিদ্ধান্তগুলির কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত পর্যালোচনা এবং ত্রুটিগুলির গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়নের মাধ্যমে এই বৈঠকগুলিকে ফলপ্রসূ করে তুলতে হবে।
তিনি রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি) তথ্য বিনিময়ের জন্য একাধিক ডিজিটাল পোর্টাল তৈরি করেছে। রাজ্যগুলিকে তিনি অনুরোধ করেন, মাদক-সংক্রান্ত সমস্ত মামলার তথ্য সময়মতো ওই পোর্টালগুলিতে আপলোড করতে, যাতে কেন্দ্র সরকার নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশ দিতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদক পাচারচক্র ক্রমাগত নিজেদের কৌশল বদলাচ্ছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়াতে নতুন নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করছে। ফলে এই চক্র ভাঙতে প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক এবং সর্বাত্মক কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
অমিত শাহ স্পষ্টভাবে জানান, অবৈধ মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকারের নীতি হবে সম্পূর্ণ আপসহীন। তবে যারা মাদকাসক্তির শিকার, তাঁদের ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, এই ধরনের ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্যের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ২৬ লক্ষ কিলোগ্রাম সিন্থেটিক মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৮ লক্ষ কিলোগ্রামে। তাঁর দাবি, এই পরিসংখ্যান সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রমাণ।
তিনি আরও জানান, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাজেয়াপ্ত মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অথচ ২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাজেয়াপ্ত মাদকের মূল্য বেড়ে প্রায় ১ লক্ষ ৮৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তাঁর মতে, এই তথ্য অবৈধ মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অভিযানের ব্যাপকতা এবং সাফল্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বক্তব্যের শেষে অমিত শাহ বলেন, মাদকমুক্ত ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার, নিরাপত্তা সংস্থা এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। তিনি পুনরায় আশ্বাস দেন, অবৈধ মাদক ব্যবসাকে কোনও অবস্থাতেই বরদাস্ত করা হবে না এবং আগামী দিনে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।






















