সিওল, ২৫ জুন (আইএএনএস): আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বৃহত্তর বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে ভারতের প্রাচীন দর্শন ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (পৃথিবী এক পরিবার)-এর কথা তুলে ধরলেন বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর।
বৃহস্পতিবার জেজু শান্তি ও সমৃদ্ধি ফোরাম ২০২৬-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, “বৈপরীত্যের বিষয় হল, আমরা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কোভিডের মতো মহামারি, সন্ত্রাসবাদ কিংবা চরম জলবায়ুগত দুর্যোগ কোনও দেশের রাজনৈতিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।”
তিনি বলেন, “আমাদের পরিচয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা মূলত জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক হওয়ায় এই সহযোগিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে ওঠে না। তাই বিশ্বের প্রতি উন্মুক্ত মনোভাব গড়ে তোলা জরুরি। ভারতে আমরা একে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ নামে জানি। বর্তমান বিশ্বের অনেক অস্থিরতার মূলে রয়েছে এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতা।”
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলির প্রসঙ্গ তুলে ধরে জয়শঙ্কর বলেন, বর্তমানে বিশ্বে অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এবং বিভিন্ন সক্ষমতার আগ্রাসী প্রয়োগ ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, “যখন কয়েকটি দেশের স্বার্থকে প্রকাশ্যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তখন বৃহত্তর বিশ্বের ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। এর মোকাবিলা করতে হলে আরও বেশি দেশকে নিয়ে আরও বেশি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়।”
একটি বিভক্ত বিশ্বে সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী।
প্রথমত, তিনি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে ঝুঁকিমুক্ত করা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে বৈচিত্র্যময় করার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক চাপ বা জবরদস্তির মোকাবিলায় স্থিতিস্থাপকতা ও বিকল্প ব্যবস্থা অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত, প্রভাবশালী দেশগুলির মধ্যে নতুন বোঝাপড়া ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। এতে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতা সহজ হবে বলে মত তাঁর।
তৃতীয়ত, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও সংঘাতের মূল্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন জয়শঙ্কর। তিনি সমুদ্র আইন সম্পর্কিত জাতিসংঘ সনদ-কে এর একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
চতুর্থত, তিনি ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলিকে আরও বেশি সুযোগ ও সক্ষমতা প্রদানের পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর মতে, এতে নতুন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি হবে।
পঞ্চমত, তিনি যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বৈশ্বিক জনকল্যাণমূলক সম্পদ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
জয়শঙ্কর বলেন, “বিশ্বের নিয়ম ও মানদণ্ড রক্ষার জন্য আমরা কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভর করতে পারি না। বিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বকেই আরও বেশি ভূমিকা নিতে হবে। এর প্রতিফলন ঘটতে হবে সংস্কারকৃত বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায়।”
তিনি আরও বলেন, এই পাঁচটি বিষয় ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া-র মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরে।
জাহাজ নির্মাণ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, “এই ক্ষেত্রগুলিতে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে অসাধারণ পরিপূরক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়গুলি নিয়ে গতকাল আমার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।”


















