আগরতলা, ২৩ জুন: রাজধানীর আমতলী থানাধীন কাঁঠালতলী এলাকায় তরুণ সংঘ ক্লাবের সম্পাদক ও বিজেপি সমর্থক সমীর দাস খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ, টিএসআর ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার জেলাশাসক ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাঁঠালতলী এলাকার বাসিন্দা সমীর দাসের সঙ্গে একই এলাকার স্বপন সূত্রধরের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। পরিবারের অভিযোগ, তাকে ক্লাব সম্পাদক বানানোর পর থেকেই তার সঙ্গে বিরোধ ওই অভিযুক্তের। সেই পূর্ব শত্রুতার জেরেই সোমবার গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটে।
জানা যায়, সোমবার রাতে সমীর দাস নিজের স্কুটি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে কাঁঠালতলী শনি মন্দিরের সামনে পৌঁছালে অভিযুক্ত স্বপন সূত্রধর তাকে স্কুটি থেকে নামিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে বলে অভিযোগ। গুরুতর জখম হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সমীর দাসের। ঘটনার পর অভিযুক্ত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
পরে স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তার ধারে রক্তাক্ত অবস্থায় সমীর দাসের দেহ পড়ে থাকতে দেখে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। খবর পেয়ে আমতলী থানার ওসি পরিতোষ দাসের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। পাশাপাশি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল ও ডগ স্কোয়াডকে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়। ফরেনসিক দল বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে এবং ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালায়।
পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জিবিপি হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। মঙ্গলবার সকালে ঘটনার জেরে এলাকায় উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায় এবং অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে সরব হন এলাকাবাসী।
এদিকে ঘটনার তদন্তে নেমে এনসিসি থানার পুলিশ ও অভয়নগর ফাঁড়ির পুলিশ ইন্দ্রনগর এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত স্বপন সূত্রধরকে আটক করে। পরে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। একইসঙ্গে মিঠুন সূত্রধরকেও আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই কাঁঠালতলী এলাকায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত স্বপন সূত্রধর ও মিঠুন সূত্রধরের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। সকাল থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ঘটনাস্থলে পশ্চিম জেলার পুলিশ সুপার নমিত পাঠক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ধ্রুব নাথ, আমতলী থানার ওসি পরিতোষ দাসসহ বহু পুলিশ আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিপুল সংখ্যক টিএসআর ও সিআরপিএফ জওয়ান মোতায়েন করা হলেও উত্তেজিত জনতাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকলে পুলিশ অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়। তবে অভিযুক্তদের স্ত্রী ও সন্তানদের বাড়ি থেকে বের করে আনার সময়ও উত্তেজিত জনতার রোষের মুখে পড়তে হয়। ঘটনাস্থলে চরম উত্তেজনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বিকেলের দিকে সমীর দাসের মরদেহ এলাকায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ মাইকিং করে এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায় এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার সতর্কবার্তা দেয়। ঘটনার পর থেকে গোটা কাঁঠালতলী এলাকা থমথমে পরিবেশে রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং টহলদারি জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার জেলাশাসক কাঁঠালতলী এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি করেছেন। জেলাশাসকের আদেশ অনুযায়ী, ২৩ জুন ২০২৬ সন্ধ্যা ৬টা থেকে আগামী ২৫ জুন ২০২৬ বিকাল ৫টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উল্লিখিত এলাকায় পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তি অস্ত্রসহ বা অস্ত্র ছাড়া একত্রিত হতে পারবেন না। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত সামরিক, আধাসামরিক ও রাজ্য পুলিশের সদস্য, সরকারি জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারী এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীদের চলাচলের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।
পুলিশ জানিয়েছে, সমীর দাস হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্ব শত্রুতার বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। তবে ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনও কারণ বা ব্যক্তি জড়িত রয়েছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে কাঁঠালতলী এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন। গোটা এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।



















