নয়াদিল্লি, ১৪ আগস্ট (আইএএনএস): স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে ভাষণে দেশের নারীশক্তি ও যুবসমাজের অগ্রগতির প্রশংসা করলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। শিক্ষাক্ষেত্র থেকে শুরু করে কৃষি, প্রতিরক্ষা, ব্যবসা ও খেলাধুলা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের মেয়েদের সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করার পাশাপাশি দেশের তরুণ প্রজন্মকে ভারতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ভারতের মেয়েরা’ আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ‘ড্রোন দিদি’দের ভূমিকা থেকে শুরু করে বায়ুসেনায় ফাইটার কমব্যাট লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন, নারীরা দেশের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
সম্প্রতি গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসের কথাও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে ভারতের পাওয়া ১৩টি সোনার পদকের মধ্যে আটটি এসেছে মহিলা ক্রীড়াবিদদের হাত ধরে।
নারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতাও দ্রুত বাড়ছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি মুর্মু। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিতে এখন ১০ কোটিরও বেশি মহিলা সদস্য রয়েছেন। ইতিমধ্যেই ৩ কোটি ‘লাখপতি দিদি’ তৈরির লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এবার আরও ৩ কোটি মহিলাকে নতুন করে ‘লাখপতি দিদি’ করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে দেশ।
‘মুদ্রা যোজনা’র আওতায় আর্থিক সহায়তা পাওয়া উদ্যোক্তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মহিলা বলেও জানান তিনি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের এই ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণকে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।
গণতন্ত্রে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও তাঁর ভাষণে বিশেষ গুরুত্ব পায়। রাষ্ট্রপতি বলেন, ভোটদানে মহিলাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ২০২৩ সালে পাশ হওয়া ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’-এর মাধ্যমে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আইনের লক্ষ্য পূরণ হলে দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মহিলাদের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হবে এবং গণতন্ত্র আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে বলে জানান তিনি।
দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। রাষ্ট্রপতি মুর্মুর মতে, এই বিপুল যুবসমাজই ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি। তরুণদের প্রতিভাবান, দক্ষ ও দায়িত্বশীল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা নতুন নতুন উদ্ভাবনী উদ্যোগ তাঁদের সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় দিচ্ছে।
সম্প্রতি গড়ে মাত্র ২৮ বছর বয়সী এক তরুণ দলের সফল রকেট উৎক্ষেপণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, এই সাফল্য মহাকাশ গবেষণায় ভারতের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পরীক্ষায় অনিয়ম বন্ধ করা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তরুণদের জন্য নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি তাঁদের সেই সুযোগ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও গুরুত্ব দেন তিনি। তরুণরা যাতে উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে, তার জন্য পরিবার ও সমাজকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
যুবসমাজের বিকাশ ও দেশ গঠনে খেলাধুলার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। ‘খেলো ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় স্তর থেকে জাতীয় স্তর পর্যন্ত একটি শক্তিশালী ক্রীড়া পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে বলে জানান তিনি। খেলাধুলায় সরকারের নজিরবিহীন বিনিয়োগের ফলে ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে একের পর এক নতুন সাফল্য অর্জন করছেন বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
ভারতের সবচেয়ে বড় যুব জনসংখ্যার পাশাপাশি প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যাও বাড়ছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি মুর্মু। তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রায় ৬ কোটি প্রবীণ নাগরিক বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি সমাজের প্রতিটি স্তরকে আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। তাঁদের মধ্যে নিজেদের সমাজের অংশ হওয়ার অনুভূতি এবং আত্মসম্মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতির ভাষণে নারীশক্তি, যুবসমাজ, ক্রীড়া, শিক্ষা এবং প্রবীণদের কল্যাণ, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের এই বিভিন্ন দিকই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।


















