নয়াদিল্লি, ৪ জুন (আইএএনএস): ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে প্রস্তাবিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইএমইসি)-কে ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুজাতিক অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ আংশিকভাবে চীনের বেল্ট এবং রোড উদ্যোগ (বিআরআই)-এর বিকল্প বা ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রকল্প হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
জি২০ শীর্ষ সম্মেলন ২০২৩-এ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে আইএমইসি-র ঘোষণা করা হয়েছিল। এর লক্ষ্য ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপকে সংযুক্ত করে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) গড়ে তোলা।
একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই করিডরের মাধ্যমে পণ্য, জ্বালানি এবং তথ্য পরিবহণের জন্য একটি নতুন ও কার্যকর রুট তৈরি করা হবে, যা বাব আল-মান্দাব এবং সুয়েজ খাল-এর উপর নির্ভরতা কমাবে।
প্রস্তাবিত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে আধুনিকীকৃত বন্দর, সমন্বিত বিদ্যুৎ গ্রিড, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সমুদ্রতলের ফাইবার-অপটিক কেবল। এর ফলে বাণিজ্য, জ্বালানি ও তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে আরও দ্রুত ও কার্যকর বিকল্প পথ তৈরি হবে।
আইএমইসি-র প্রধান অংশীদার দেশগুলির মধ্যে রয়েছে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইসরায়েল, জর্ডান, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে এই উদ্যোগে কাতার, ওমান, তুরস্ক, ইরাক এবং ইরান অন্তর্ভুক্ত নয়।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতের কারণে প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত থাকলেও এর প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় আরও বেড়েছে। আইএমইসি হোক বা অন্য কোনও আন্তঃমধ্যপ্রাচ্য পরিবহণ প্রকল্প, আঞ্চলিক দেশগুলি ভবিষ্যতে আরও সংযুক্ত ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, ২০২১ সালে সুয়েজ খালে জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনা এবং ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য রুটের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইএমইসি চালু হলে ভারত থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই করিডরের দীর্ঘমেয়াদি সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে। করিডরের সঙ্গে ফাইবার-অপটিক কেবল স্থাপন করা হলে তথ্য পরিবহণের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে এবং বাব-আল-মান্দাব অঞ্চলের উপর নির্ভরতা কমবে।
নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণ নীতির সঙ্গে আইএমইসি-র লক্ষ্য ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বর্তমানে বিশ্বে উৎপন্ন মোট তথ্যের প্রায় ২০ শতাংশ ভারতে তৈরি হলেও, বিশ্বের ডেটা সেন্টার ক্ষমতার মাত্র ৩ শতাংশ ভারতের হাতে রয়েছে। এই ব্যবধান কমাতে আন্তর্জাতিক তথ্য পরিবহণ এবং সমুদ্রতলের কেবল নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রয়োজন।
ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলির মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির সঙ্গে বন্দর, রেল এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। বর্তমানে প্রযুক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ভারত-উপসাগরীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ভারতের মধ্যে উচ্চগতির ও কম বিলম্বিত তথ্য আদান-প্রদানের সুবিধা আইএমইসি-কে শুধু একটি বাণিজ্য করিডর নয়, বরং ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।



















