আগরতলা, ১ জুন: কলকাতার একটি চলন্ত বাসে ত্রিপুরার এক বাঙালি তরুণীকে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে হেনস্থা করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিভিন্ন মহল থেকে এই ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
জানা গেছে, কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ধরে কলকাতায় বসবাসকারী ওই তরুণী সম্প্রতি একটি পাবলিক বাসে যাত্রা করছিলেন। বাসে চলাকালীন তিনি ত্রিপুরার আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় কথা বলছিলেন। অভিযোগ, তাঁর কথাবার্তা শুনে বাসে উপস্থিত কয়েকজন যাত্রী তাকে ‘বাংলাদেশী’ বলে কটাক্ষ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ওই তরুণী প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ জানান। সেই সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণী দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন যে তিনি ভারতের নাগরিক এবং গত চার-পাঁচ বছর ধরে কলকাতায় কর্মসূত্রে রয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শুধুমাত্র আঞ্চলিকতা বা ভিন্ন উচ্চারণে বাংলা বলার কারণে কাউকে ‘বাংলাদেশী’ বলে আখ্যা দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত। তাঁর বক্তব্য, ত্রিপুরা, আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বহু মানুষ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় কর্মসূত্রে বসবাস করেন এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই কথা বলেন। তাই ভাষার টানকে কেন্দ্র করে কাউকে বাংলাদেশি বলে অপমান করা অনভিপ্রেত ও অগ্রহণযোগ্য।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই নেটিজেনদের একাংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, দেশের এক প্রান্তের নাগরিককে শুধুমাত্র ভাষা বা উচ্চারণের ভিত্তিতে প্রশ্নবিদ্ধ করা সংবিধানের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহু মানুষ তরুণীর পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের অনেকেই ভিডিওর কমেন্ট বক্সে নিজেদের পূর্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেরই বক্তব্য বিগত দিনে কলকাতায় শিক্ষা স্বাস্থ্য অথবা কর্মসূত্রে গিয়ে একইভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন অনেকেই। ত্রিপুরার আঞ্চলিক ভাষার কারণে তাদেরকে ‘ বাংলাদেশি’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অনেকেই ওই তরুণের সাহসী প্রতিবাদকে সমর্থন জানিয়েছেন। আবার অনেকেই পশ্চিমবঙ্গের এধরনের মানসিকতা সম্পন্ন জনগণের দেশের রাজ্য সম্পর্কে শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দেশের কয়টি রাজ্য এবং তাদের ভাষাগত বৈচিত্র্য নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ওই সকল জনগণ অবগত নয় বলেই হোক প্রকাশ করলেন একাংশ ত্রিপুরাবাসী।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা প্রান্তে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষকে ভাষা, চেহারা কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। গত ডিসেম্বরেই দেরাদুনে ত্রিপুরার এঞ্জেল চাকমাকে ভাষা, চেহারা কিংবা সাংস্কৃতিক বিদ্বেষের কারণে প্রাণ দিতে হয়েছে। এই ঘটনায় গোটা দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই ফের কলকাতার এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ভারতের মতো বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক দেশে ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক উচ্চারণ বা ভাষার ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে কাউকে অপমান করা সামাজিক সম্প্রীতির পরিপন্থী এবং তা জাতীয় সংহতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ঘটনার পর সাধারণ মানুষের একাংশ দাবি করেছেন, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য বা হেনস্থার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশের যেকোনো প্রান্তে কর্মরত বা বসবাসকারী নাগরিকদের পরিচয় ও মর্যাদাকে সম্মান জানানোই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং আত্মিক সম্পর্ক বহুদিনের। ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার নানা ক্ষেত্রে দুই রাজ্যের মানুষের মধ্যে গভীর মিল লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সূত্রে ত্রিপুরার অসংখ্য মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস ও কর্মরত রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গেরও অনেকেই কর্মসূত্রে ত্রিপুরার বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করছেন। একইভাবে দুই রাজ্যের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের সম্পর্কও সুদৃঢ়।
তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ভাষার আঞ্চলিকতার কারণে একজন ভারতীয় নাগরিককে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে হেনস্থা করার মতো ঘটনা দুই রাজ্যের দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এটি কয়েকজন ব্যক্তির আচরণ, তবুও এ ধরনের ঘটনা বৃহত্তর সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত বার্তা বহন করে।
সচেতন মহলের অভিমত, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে, তা অটুট রাখতে হলে ভাষা, আঞ্চলিকতা বা পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করা জরুরি। কারণ বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে দুই রাজ্যের মানুষের দীর্ঘদিনের আন্তরিক সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে পড়ুক, তা কেউই কামনা করেন না।



















