নিখিল চন্দ্র ভদ্র – ঢাকা
সন্দীপ বিশ্বাস – আগরতলা
২৩ মার্চ৷৷ ভারত ও বাংলাদেশের মৈত্রীর আদান প্রদানের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী রইলেন দুই রাষ্ট্রের জনগণ৷ বাংলাদেশ থেকে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আমদানি এবং ত্রিপুরা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে আজ৷ এদিন সকালে নিজ অফিস কক্ষে বসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প দুটির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন৷ ভিডিও কনফারেন্সে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সঙ্গী ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও৷ এদিন, মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের পাশাপাশি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যমন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যরা৷
এই উপলক্ষ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ আমদানি এবং ব্যান্ডউইথ রপ্তানির মাধ্যমে দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি মাইলফলক স্থাপন করল বলে মন্তব্য করেন৷ এদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই উপলক্ষ্যে বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা এর মাধ্যমে সারা বিশ্বের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে৷ এদিন, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদান প্রদানের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো নিবিড় হবে৷
এদিন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাথে ভারতের সম্পর্কের গভীরতা প্রসঙ্গ টেনে আনেন৷ অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও ভারত-বাংলার সম্পর্ক ক্রমেই মজবুত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন৷ এই প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক কিভাবে মধুর করা যায় এধরনের আদান প্রদানের মাধ্যমে সারা বিশ্বের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছে৷ এদিন তিনি, সারা দেশের সাথে পূর্ব ভারত এবং পূর্বোত্তরকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, ইতিমধ্যে পশ্চিম এবং দক্ষিণ ভারতে দুটি ইন্টারনেট গেইটওয়ে রয়েছে৷ এখন পূর্ব ভারতেও ইন্টারনেট গেইটওয়ে স্থাপন করে এই অঞ্চলকে সারা দেশের সাথে প্রযুক্তিগতভাবে সংযুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে৷ এরই ফলস্বরূপ ত্রিপুরায় ইন্টারনেট গেইটওয়ে স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়৷ তাতে পূর্ব ভারত বিশেষ করে পূর্বোত্তর নবীন প্রজন্ম বিশেষভাবে উপকৃত হবেন৷ তথ্য প্রযুক্তির দুনিয়ায় নবচেতনার উন্মোচনে ইন্টারনেট গেইটওয়ে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন৷ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ত্রিপুরায় ব্যান্ডউইথ ইন্টারনেট পরিষেবা শুরু হওয়ায় সমগ্র অঞ্চলের বিকাশের পথে বিশেষভাবে সহায়তা করবে৷ এদিন তিনি বলেন, নদীপথ, স্থলপথ এবং বিমানপথে বাংলাদেশের সাথে ইতিমধ্যেই যুক্ত হয়েছে ভারত৷ এখন মহাকাশে বঙ্গবন্ধু উপগ্রহের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করার আশা প্রকাশ করেন তিনি৷ এদিকে, ত্রিপুরা থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি মাইলফলক স্থাপন করল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিা৷ বুধবার সকালে গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ত্রিপুরা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি ও ১০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইত রপ্তানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন৷ এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী৷
দুই দেশের সমান অগ্রগতি কামনা করে শেখ হাসিনা বলেন, এ অঞ্চলের উন্নয়নে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায় বাংলাদেশ৷ মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি বলেন, এ বন্ধন আজও অটুট৷ দুদেশের সহযোগিতা সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে৷ এ অঞ্চলকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷
এ সময় স্বাধীনতা দিবসের আগাম শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷ শুভেচ্ছা জানান হোলি উৎসবের৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভারতের জনগণকে হোলির শুভেচ্ছা জানান৷
পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সে রাজ্যে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উদ্যান উদ্বোধনের আমন্ত্রণ জানান৷
এদিন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, কেন্দ্রীয় টেলিকমমন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদ সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের সচিব৷ এদিকে, বাংলাদেশের গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলি, বিদেশ প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদুল হক এবং বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলা৷
প্রাথমিকভাবে ভারতের ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের কুমিল্লায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে৷ এই বিদ্যুৎ কুমিল্লা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যবহৃত হবে৷ আমদানিকৃত এই বিদ্যুতেরপ্রতি ইউনিটের দাম পড়বে ৬ টাকা ৪৯-৫০ পয়সা (সাড়ে ৬ টাকা) বন্ধুসুলভ মনোভাব রেখে ভারত আমাদের এই বিদ্যুৎ দিচ্ছে৷ ত্রিপুরা থেকে ভবিষ্যতে আরো বিদ্যুৎ আমদানির জন্য আমরা অনুরোধ করেছি৷ আশা করছি ভবিষ্যতে ত্রিপুরা থেকে আরো একশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে৷
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিঃ (পিজিসিবি) সূত্রে জানা যায়, ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের কুমিল্লা পর্যন্ত ৪০০ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে দ্বিতীয় আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে৷ এর আগে ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পিজিসিবি নির্মিত প্রথম আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে কমবেশি ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়৷
এছাড়া বাংলাদেশ থেকে ১০ জিবিপিএস (গিগাবাইট পার সেকেন্ড) ব্যান্ডউইথ (ইন্টারনেট) ত্রিপুরায় ব্যান্ডউইথ রপ্তানিও শুরু হচ্ছে বুধবার থেকে৷ বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী দেশে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহের পর উদ্ধৃত্ত ব্যান্ডউইথ ভারতে রপ্তানি করতেই গত ১৬ নভেম্বর আখাউড়া স্থলবন্দরের পাশে জিরো পয়েন্টের কাছে বিএসএনএল (ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড) স্থাপিত অপটিক্যাল ফাইবারের সঙ্গে বিটিসিএল’র রিডান্ডেন্সি স্থাপিত হয়৷ প্রাথমিকভাবে ১০ গিগাবাইট পরিমাণ ব্যান্ডউইথ রপ্তানির কথা থাকলেও পরবর্তীতে ধাপে ধাপে চল্লিশ গিগাবাইট পরিমাণ ব্যান্ডউইথ রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে৷
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণে ভারত ও বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক আগামী দিনে আরো মজবুত হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন৷ পাশাপাশি দুই রাষ্ট্র মিলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নে অংশীদার হবে বলে জানান৷
এদিন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, আজকের দিনটি গোটা রাজ্যবাসীর পাশাপাশি সারা দেশের জন্য অত্যন্ত আনন্দের৷ আজ এক ঐতিহাসিক দিন৷ ভারত থেকে বাংলাদেশকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজ শুরু হয়েছে৷ আমরাও বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ পেলাম৷ এই ব্যবস্থা আমাদের রাজ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন৷ পাশাপাশি বলেন, বাংলাদেশ সরকার সহায়তা করলে পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব হত না৷ এই প্রকল্পের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে আনা হয়েছে৷ এজন্য তিনি আবারও বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন৷
ভারত-বাংলা মৈত্রীর আদান প্রদানে নয়া দিগন্তের সূচনা, বাংলাদেশে গেল বিদ্যুৎ, ত্রিপুরা পেল ব্যান্ডউইথ
Releated Posts
শস্য সাইলো প্রকল্পে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ খারিজ করল এফসিআই
নয়াদিল্লি, ২ জুন (আইএএনএস): শস্য সংরক্ষণের আধুনিক সাইলো প্রকল্পের বরাত প্রদানের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব ও একচেটিয়া ব্যবসাকে উৎসাহ দেওয়ার…
অসম বিধানসভায় ইউসিসি পাস, ‘প্রত্যেক নাগরিকের জন্য অভিন্ন আইন কার্যকর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’: অমিত শাহ
নয়াদিল্লি, ২৭ মে (আইএএনএস): অসম বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) বিল পাস হওয়ায় রাজ্যের মানুষকে অভিনন্দন জানালেন কেন্দ্রীয়…
কাবুলের হাসপাতালে পাকিস্তানি হামলার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি পুনর্ব্যক্ত রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ দূতের
কাবুল, ২২ মে (আইএএনএস): আফগানিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ দূত রিচার্ড বেনেট কাবুলের ওমিদ পুনর্বাসন হাসপাতালে পাকিস্তানের…
ভার্চুয়াল মাধ্যমে ‘মুখ্যমন্ত্রী সমীপেষু’ কর্মসূচির সূচনা, ধলাই জেলার ৩৫ জনের অভিযোগ শুনলেন মুখ্যমন্ত্রী
আগরতলা, ২০ মে : রাজ্যের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় করতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ‘মুখ্যমন্ত্রী সমীপেষু’…


















