News Flash

  • Home
  • Uncategorized
  • ভারতের গর্ব : ভগবান বিরসা মুন্ডা
Image

ভারতের গর্ব : ভগবান বিরসা মুন্ডা

ড. এল মুরাগন

ভারত যখন আজাদি কা অমৃত মহোৎসব উদযাপন করছে, তখন একটি মহান নাম তারাদের ছায়াপথের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যিনি নির্ভয়ে অত্যাচারী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য কাজ করেছিলেন। তিনি হলেন ভগবান বিরসা মুন্ডা। বিরসা মুন্ডার মাত্র পঁচিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন, কিন্তু এই সময়কালে তিনি সাহসী জীবন যাপন করেছিলেন৷ তাঁর বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপ এবং মহৎ কাজ ভগবানকে তাঁর অসংখ্য অনুসারী তৈরি করেছিল। তার জীবন কাহিনী অন্যায় এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহসী প্রচেষ্টায় পূর্ণ, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব৷
 
১৮৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর ঝাড়খন্ডের উলিহাতু গ্রামে জন্মগ্রহণকারী বিরসা আদিবাসী মুন্ডা পরিবারে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে তার শৈশব অতিবাহিত করেছিলেন। এই সময় শোষণকারী ব্রিটিশ রাজ মধ্য ও পূর্ব ভারতের গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সাথে আদিবাসীদের ঐক্যকে বিঘ্নিত করতে শুরু করে। ব্রিটিশরা ছোট নাগপুর অঞ্চলে জনজাতিদের ‘খুন্কাট্টি’ কৃষি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে একটি সামন্ততান্ত্রিক জমিদারী প্রথা চালু করে। ব্রিটিশ রাজ মহাজন এবং ঠিকাদার, বহিরাগতদের নিয়ে আসে, সেইসাথে সামন্ত জমিদারকেও, যারা আদিবাসীদের শোষণে ব্রিটিশদের সহায়তা করে। বনবাসী আদিবাসীদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক লোকাচারকে অপমান এবং হস্তক্ষেপ করে মিশনারি ক্রিয়াকলাপ নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্রিটিশ রাজের সক্রিয় সমর্থনে কাজ করতে থাকে৷
 
তরুণ বিরসা তার চোখের সামনে এই সমস্ত উন্মোচন দেখে বড় হয়েছিলেন, এবং বুঝতে শুরু করেছিলেন যে এই ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি (আদিবাসীদের বহিরাগত -শত্রুরা) কীভাবে স্থানীয় জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছিল। এই অপবিত্র যোগসাজশের বিরুদ্ধে লড়াই করার সংকল্প দৃঢ় করার জন্য একটি তাই জ্বালানি হিসাবে কাজ করেছিল।


১৮৮০-এর দশকে তরুণ বিরসা ব্রিটিশ রাজে পিটিশন পাঠানোর অহিংস পদ্ধতির মাধ্যমে জনজাতিদের অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতে এই অঞ্চলের সর্দারিলারাই আন্দোলন খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তথাপি অত্যাচারী ঔপনিবেশিক শাসকরা এই দাবিগুলিতে কোনও মনোযোগ দেয়নি। জমিদারী ব্যবস্থা সহসাই আদিবাসীদের জমির মালিকের মর্যাদা থেকে ভূমি শ্রমিকের মর্যাদায় নামিয়ে আনে। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থাপন বনাঞ্চলের উপজাতীয় এলাকায় জোরপূর্বক শ্রম (ভেথবিগারি) তীব্রতর করে। দরিদ্র, নিরীহ আদিবাসীদের শোষণ এমতাবস্থায় একটি ব্রেকিং পয়েন্টে দাঁড়ায়।
 
এই সমস্ত কিছুকে বিরসা আদিবাসীদের বিদ্রোহের কারণ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি আদিবাসীদের ধর্মীয় ক্ষেত্রে একটি নতুন আলো দেখিয়েছিলেন। তিনি মিশনারিদের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন যারা উপজাতীয় জীবন ও সংস্কৃতিকে অপমান করছিল। একই সময়ে, বিরসা ধর্মীয় রীতিনীতি পরিশোধন এবং সংস্কারের জন্য কাজ করেছিলেন, অনেক কুসংস্কারাচ্ছন্ন আচারকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, নতুন নীতি, নতুন প্রার্থনা নিয়ে এসেছিলেন, অনেক অভ্যাসের সংস্কার করেছিলেন এবং জনজাতিদের গর্ব পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করার জন্য কাজ করেছিলেন। বিরসা “সিরমরেফিরুন রাজা জয়” বা ‘পৈতৃক রাজার জয়’ সম্পর্কে আদিবাসীদের মুগ্ধ করে তুলেছিলেন, এইভাবে জমির উপর আদিবাসীদের পৈতৃক স্বায়ত্তশাসন নিয়ন্ত্রণে সার্বভৌমত্বের আহ্বান করেছিলেন। বিরসা একজন গণনেতা হন, এবং তাঁর অনুসারীদের জন্য তিনি ভগবান এবং ধারাতি আবা হিসাবে বিবেচিত হতে শুরু করেন।


তিনি আদিবাসীদের সমস্ত স্বার্থান্বেষী এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন। তিনি জানতেন আসল শত্রু কে৷ বিরসা মুন্ডা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছিলেন যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন সমস্ত সমস্যা এবং নিপীড়নের মূল কারণ। তাঁর কাছে এটা পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল যে ” আবুয়া রাজ সেতারজানা, মহারানী রাজ তুন্ডুজানা (অর্থ: রানীর রাজ্য শেষ হোক এবং আমাদের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হোক)এই বলে ভগবান বিরসা জনসাধারণের মনে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। মুন্ডা, ওরাং, অন্যান্য আদিবাসী এবং অআদিবাসীরা তার আহ্বানে সাড়া দেয় এবং তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য বিরসার নেতৃত্বে ঔপনিবেশিক প্রভু এবং শোষণকারীদের বিরুদ্ধে ‘উলগুলান’ বা বিদ্রোহে যোগ দেয়। বিরসা জনগণকে কোনও ভাড়া না দিতে বলেন, সামন্ততান্ত্রিক, মিশনারি এবং ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাজ কর্তৃপক্ষের আউটপোস্টগুলিতে আক্রমণ করেন। ঐতিহ্যবাহী তীর-ধনুক দিয়ে মধ্য ও পূর্ব ভারতের আদিবাসীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু, তা করতে গিয়ে বিরসা সতর্ক ছিলেন যে, কেবল মাত্র প্রকৃত শোষকদের উপরই আক্রমণ করা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ সমস্যায় না পড়েন। বিরসা জীবনীশক্তি এবং দেবত্বের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন। শীঘ্রই ব্রিটিশ পুলিশ তাকে বন্দী করে কারাগারে বন্দী করে, যেখানে তিনি ১৯০০ সালের ৯ জুন বন্দী অবস্থায় মারা যান। কিন্তু ভগবান বিরসা মুন্ডার উৎসাহী সংগ্রাম বৃথা যায়নি। এটি ব্রিটিশ রাজকে আদিবাসীদের দুর্দশা এবং শোষণের বিষয়টিকে বিবেচনা করতে বাধ্য করে এবং আদিবাসীদের সুরক্ষার জন্য ‘১৯০৮ সালের ছোট নাগপুর টেনেন্সি অ্যাক্ট’ নিয়ে আসে। এই গুরুত্বপূর্ণ আইনটি আদিবাসীদের জমি অ-আদিবাসীদের কাছে হস্তান্তর করা বন্ধ করে, যা আদিবাসীদের জন্য বিশাল স্বস্তি এনে দেয় এবং উপজাতি অধিকার রক্ষার জন্য একটি যুগান্তকারী আইনে পরিণত হয়। ব্রিটিশ শাসকরাও ভেথবিগারি বা জোরপূর্বক শ্রম বিলুপ্ত করার পদক্ষেপ নিয়েছিল।
 
ভগবানবিরসা মুন্ডা লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন, এমনকি তাঁর মৃত্যুর ১২১ বছর পরেও। তিনি বীরত্ব, সাহস এবং নেতৃত্বের একজন আইকন। তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন যিনি তাঁর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং মহান ঐতিহ্যের জন্য অত্যন্ত গর্বিত ছিলেন, কিন্তু একই সাথে যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিজের বিশ্বাসের সংস্কার করতে পিছপা হননি৷
 
ভগবান বিরসা মুন্ডা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম উচ্চতম আইকন। মুন্ডা, ওরাং, সাঁওতাল, তামার, কোল, ভীল, খাসি, কোয়াস এবং মিজোস্তোর মতো বেশ কয়েকটি উপজাতি সম্প্রদায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শক্তিশালী করেছিল। আদিবাসী সম্প্রদায় দ্বারা আয়োজিত বিপ্লবী আন্দোলন ও সংগ্রাম তাদের অপরিসীম সাহস এবং সর্বোচ্চ ত্যাগ এর মাধ্যমে চিহ্নিত হয়েছিল এবং সারা দেশের ভারতীয়দের অনুপ্রাণিত করেছিল। তবে যে কারণেই হোক না কেন, প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসবিদরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের অপরিসীম অবদানের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারেননি।
 
কিন্তু আমাদের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী সমস্ত ভারতীয়দের আজাদিকামমৃতমহোৎসব উদযাপনের জন্য এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই জাতীয় অনেক অখ্যাত বীরের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ অধ্যয়ন ও বোঝার জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বে এখন প্রথমবারের মতো, ভগবানবিরসা মুন্ডার জন্মবার্ষিকীতে প্রতি বছর ১৫ নভেম্বরের দিনটিকে জনজাতি গৌরব দিবস হিসেবে উদযাপন করে আদিবাসীদের গর্ব এবং অবদানকে উপযুক্ত শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।

এই জনজাতি গৌরব দিবসে আসুন আমরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বীরত্ব, আতিথেয়তা ও জাতীয় গর্বের ভারতীয় মূল্যবোধ প্রচারের জন্য আদিবাসী জনগণের প্রচেষ্টাকে স্মরণ করি এবং স্বীকৃতি দিই।

( লেখকঃ কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার, মত্স, পশুপাল ও দুগ্ধ প্রতিমন্ত্রী )

Releated Posts

কর্ণাটক মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে কেউ ইস্তফা দেননি, দলে কোনও অসন্তোষ নেই: কংগ্রেস সভাপতি বি. কে. হরিপ্রসাদ

বেঙ্গালুরু, ৪ আগস্ট (আইএএনএস): কর্ণাটকে সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণকে ঘিরে কংগ্রেসের অন্দরে ব্যাপক অসন্তোষের জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে কর্ণাটক প্রদেশ…

ByByNews Desk Aug 4, 2026

সমঝোতার সম্ভাবনায় আপাতত ইরানে হামলা স্থগিত, দাবি ট্রাম্পের; হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার কথাও উল্লেখ

ওয়াশিংটন, ২ আগস্ট (আইএএনএস): যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত…

ByByNews Desk Aug 2, 2026

সূর্য ঘরে এখন ১৫ মেগাওয়াটের শক্তি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নীরব বিপ্লব রাজ্যে

আগরতলা, ২৮ জুলাই:একটি বাড়ির ছাদে কয়েকটি সোলার প্যানেল। সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎ যাচ্ছে বাড়ির আলো,…

ByByReshmi Debnath Jul 28, 2026

অক্সিলিয়াম গার্লস স্কুলে ‘আউক্সি ইগনিট এনোএল এক্সিবিশন ২০২৬’, ছাত্রীদের সৃজনশীলতা ও প্রতিভার প্রকাশ

আগরতলা, ২৫ জুলাই: ছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশের লক্ষ্যে অক্সিলিয়াম গার্লস স্কুল, আগরতলার উদ্যোগে বিদ্যালয়…

ByByNews Desk Jul 25, 2026

রোমানিয়ায় ভারতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের প্রসারে প্রবাসীদের ভূয়সী প্রশংসা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর

বুখারেস্ট, ২৫ জুলাই (আইএএনএস): ভারত ও রোমানিয়ার জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি…

ByByNews Desk Jul 25, 2026

ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা যুবসমাজ, সন্তানহারা পরিবার ও ঐক্যবদ্ধ বিরোধীদের জয়: মল্লিকার্জুন খাড়গে

নয়াদিল্লি, ২৫ জুলাই (আইএএনএস): কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে শনিবার দাবি করেছেন, এটি…

ByByNews Desk Jul 25, 2026

সমীক ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে নেতাজিকে অবমাননার অভিযোগ, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি ফরওয়ার্ড ব্লকের

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৯ জুলাই:পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি সমীক ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ…

ByByReshmi Debnath Jul 20, 2026

সোনম ওয়াংচুকের হাসপাতালে ভর্তি বিতর্ক: আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান আন্না হাজারের

আহমেদনগর (মহারাষ্ট্র), ১৮ জুলাই (আইএএনএস): জলবায়ু আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতির জেরে তাঁকে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি…

ByBySandeep Biswas Jul 18, 2026

রথকাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি প্রদেশ কংগ্রেসের

আগরতলা, ১৬ জুলাই: তিন বছর আগে কুমারঘাটে রথযাত্রার সময় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১০ জন ভক্তের মৃত্যুর ঘটনায়…

ByByTaniya Chakraborty Jul 16, 2026
Scroll to Top