বিশাখাপত্তনম, ৬ অক্টোবর (আইএএনএস): ভারতীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার আহ্বান জানালেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি বলেন, শুধু আত্মনির্ভরশীল হওয়াই ভারতের লক্ষ্য নয়, দেশের জাহাজ নির্মাণ সংস্থাগুলিকে এমন পর্যায়ে পৌঁছতে হবে, যাতে ভারতীয় নৌবাহিনীর পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও জাহাজ এবং সামুদ্রিক পরিষেবা সরবরাহ করা যায়।
অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে হিন্দুস্তান শিপইয়ার্ড লিমিটেড (এইচএসএল)-এ ফ্লিট সাপোর্ট শিপ-১ (এফএসএস-১) উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজনাথ সিং বলেন, আত্মনির্ভরতা ভারতের যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে ওঠাই পরবর্তী বড় লক্ষ্য।
তিনি বলেন, জাহাজ নির্মাণে ভারতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে সক্ষমতায় এবং সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষমতায় রূপান্তর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো জাহাজ সরবরাহ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দেশীয় নকশা তৈরির সক্ষমতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা, দক্ষ কর্মী, উৎপাদন ক্ষমতা এবং ব্যয়ের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার মতো বিষয়গুলিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে রাজনাথ সিং এফএসএস-১-এর উদ্বোধন করার পাশাপাশি ফ্লিট সাপোর্ট শিপ-৫ (এফএসএস-৫)-এর কিল স্থাপন করেন। একইসঙ্গে উন্নত স্লিপওয়ে-৪ এবং ৩০০ টনের গলিয়াথ ক্রেনের উদ্বোধন করেন তিনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, জাহাজ উদ্বোধন ভারতের অর্জনের প্রতীক, কিল স্থাপন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতীক এবং নতুন স্লিপওয়ে দেশের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার প্রতীক।
গত এক দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলেও জানান তিনি। আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে ভারত এখন দেশেই আরও উন্নত ব্যবস্থা ও প্ল্যাটফর্মের নকশা ও উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে। উন্নত যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন নির্মাণে ভারতীয় জাহাজ নির্মাণ সংস্থাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও জানান তিনি।
ভারতীয় নৌবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে রাজনাথ বলেন, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌবাহিনী বারবার প্রথম সাড়াদানকারী এবং নিরাপত্তার পছন্দের অংশীদার হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা, জলদস্যুবিরোধী অভিযান, উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার অভিযান কিংবা সামুদ্রিক নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নৌবাহিনী প্রস্তুতি ও দৃঢ়তা দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের সামুদ্রিক শক্তি শুধু নৌবাহিনী বা শুধু জাহাজ নির্মাণ সংস্থার মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় সামুদ্রিক পরিকাঠামো প্রয়োজন। নৌবাহিনী, এইচএসএল, ডিআরডিও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প সংস্থা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্টার্টআপগুলিকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এফএসএস-১-এর উদ্বোধন ভারতীয় নৌবাহিনীর দূরবর্তী এলাকায় পৌঁছনোর ক্ষমতা, দীর্ঘ সময় অভিযান চালানোর সক্ষমতা এবং সামগ্রিক কার্যক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেও মন্তব্য করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
রাজনাথ সিং এইচএসএল-কে ভারতের জাতীয় সামুদ্রিক সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, আট দশকেরও বেশি সময় ধরে এইচএসএল দেশের সামুদ্রিক ও প্রতিরক্ষা প্রয়োজন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে আসার পর সংস্থাটির আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং ২০২৫ সালে মিনিরত্ন ক্যাটেগরি-১ মর্যাদা অর্জন তার পরিবর্তনেরই প্রমাণ বলে জানান তিনি।
তবে শুধু একটি জাহাজ নির্মাণ সংস্থাকে শক্তিশালী করাই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করে রাজনাথ বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ জাহাজ নির্মাণ শিল্প-পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। বিশাখাপত্তনমকে শুধু একটি জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘মেরিটাইম ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, অন্ধ্রপ্রদেশের বৃহত্তর শিল্প ব্যবস্থার সঙ্গে এইচএসএল-এর আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। রাজ্যের এমএসএমই সংস্থাগুলি সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলি ডিজিটাল জাহাজ নির্মাণে সহযোগিতা করতে পারে এবং স্টার্টআপগুলি সামুদ্রিক প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে। একইসঙ্গে লজিস্টিক ও বন্দর পরিকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের একটি বৃহত্তর পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে জানান তিনি।



















