জেনেভা, ৫ অক্টোবর (আইএএনএস): বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ‘গুরুতর সাংবিধানিক সংকটের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ কোনও ভয় বা শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং বাংলাদেশের জনগণের ‘মুক্ত ও সচেতন ইচ্ছার’ ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।
জেনেভা প্রেস ক্লাবে সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট: শিক্ষার অধিকার, নির্বিচারে আটক এবং মনগড়া ট্রাইব্যুনাল রায়’ শীর্ষক একটি সেমিনারে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন হাসিনা। অনুষ্ঠানে প্রাক্তন রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক এবং ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
আওয়ামি লিগের তরফে জানানো হয়েছে, সেমিনারে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।
হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি বাংলাদেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে পারেনি। বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, নির্বিচারে আটক এবং রাজনৈতিক প্রভাবিত আইনি পদক্ষেপের অভিযোগও তোলেন তিনি।
তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ছাত্র ও নাগরিকদের শিক্ষা এবং পেশাগত ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় হিংসা, মৃত্যু, গ্রেপ্তার এবং নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা ঘটলেও তার অনেক কিছুই সংবাদমাধ্যমে পৌঁছায় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাসিনা বলেন, পরিস্থিতিকে আর শুধুমাত্র রাজনৈতিক অস্থিরতা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি এখন আইন, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত একটি সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে দমন-পীড়নের অভিযোগও তোলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কিছু ছাত্র ভর্তি বা সার্টিফিকেট হারিয়েছেন এবং তরুণ পেশাজীবীদের চাকরি থেকে বরখাস্ত বা সাসপেন্ড করা হয়েছে।
আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের গ্রেপ্তার, মামলা এবং আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ তুলে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন হাসিনা। তিনি বলেন, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার করতে হবে।
আওয়ামি লিগকে রাজনৈতিক জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিচার বিভাগ ও ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিশোধের জন্য বিচার প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হলে বিচারব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে হাসিনা বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে রাষ্ট্রের কোনও ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করা উচিত নয়।
আওয়ামি লিগের উপর নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, কোনও বড় রাজনৈতিক শক্তি ও তার সমর্থকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া হলে সেই নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল বলা যায় না।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে বলে মন্তব্য করে হাসিনা বলেন, সেই সিদ্ধান্ত ভয়, শক্তি বা প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের মুক্ত ও সচেতন মতামতের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
জাতিসংঘ, গণতান্ত্রিক দেশগুলির সরকার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী মহল এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের পরিস্থিতির উপর নজর রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নির্বিচারে আটক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ছাত্র ও পেশাজীবীদের সুরক্ষা, হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।



















