কৈলাসহর, ২১ সেপ্টেম্বর: ইউকো ব্যাঙ্কের ঋণ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়ম এবং গ্রাহকের সঞ্চয়ী হিসাব থেকে অনুমতি ছাড়াই বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ইউকো ব্যাঙ্কের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক সুরজিৎ মল্লিকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন কৈলাসহরের দুর্গাপুর এলাকার বাসিন্দা সরকারি কর্মচারী ও ব্যাংক গ্রাহক দিলীপ কুমার দাস।
অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাংকের গুয়াহাটি জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার ও ফিল্ড ইন্সপেক্টরের কাছে লিখিত আবেদন করে ঋণ সংক্রান্ত নথি, টাকা উত্তোলনের রসিদ এবং তাঁর সঞ্চয়ী হিসাব থেকে হওয়া লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
অভিযোগপত্রে দিলীপ কুমার দাস জানিয়েছেন, ২০২১ সালের জুলাই মাসে তিনি ইউকো ব্যাঙ্কের ধর্মনগরের চন্দ্রপুর শাখায় ১০ লক্ষ টাকার গৃহঋণের জন্য আবেদন করেন। তাঁর দাবি, ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঋণটি অনুমোদিত হয় এবং প্রথম পর্যায়ে তাঁকে ৯ লক্ষ টাকা ঋণ দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীর দাবি, গৃহঋণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক সুরজিৎ মল্লিক তাঁকে কয়েকটি টাকা উত্তোলনের রসিদে স্বাক্ষর করতে বলেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা রেখে তিনি ওই রসিদগুলিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বলে জানিয়েছেন দিলীপবাবু।
তবে পরবর্তীতে তাঁর অভিযোগ, ওই স্বাক্ষর করা টাকা উত্তোলনের রসিদ তাঁর অজ্ঞাতসারে ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা তোলা হয়। ব্যাংকের নথি ও স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করে তাঁর দাবি, তাঁর সঞ্চয়ী হিসাব থেকে মোট ১১ লক্ষ ৯৪ হাজার ৫৬৯ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। পাশাপাশি, তাঁর ঋণ হিসাবে মোট ২২ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগপত্রে আরও একটি ঋণের বিষয় উল্লেখ করেছেন দিলীপ কুমার দাস। তাঁর দাবি, ২০২২ সালে তাঁকে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত শংসাপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর নামে ২ লক্ষ ৪২ হাজার টাকার একটি ঋণ ১৮ মার্চ ২০২২ তারিখে অনুমোদন ও উত্তোলন করা হয়েছে বলে তিনি জানতে পারেন। অভিযোগপত্রে ওই ঋণ হিসাবের নম্বরও উল্লেখ করেছেন তিনি।
দিলীপবাবুর দাবি, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি ব্যাংক থেকে পাওয়া স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা করার সময় বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। এরপর ১৯ জানুয়ারি তিনি ব্যাংক ম্যানেজারের কাছে লিখিত আবেদন করে তাঁর অ্যাকাউন্টে হওয়া মোট ২৫টি লেনদেনের টাকা উত্তোলনের রসিদের কপি চান।
অভিযোগকারীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বারবার অনুরোধ করার পরও সমস্ত নথি তাঁকে দেওয়া হয়নি। ২৫টি টাকা উত্তোলনের রসিদের মধ্যে সাতটি এখনও তাঁর হাতে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও ব্যাংক ম্যানেজার ওই সাতটি রসিদের হদিশ পাননি।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, ব্যাংকের এক কর্মী দিলীপবাবুকে জানিয়েছেন যে তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক ব্যাংক ছাড়ার সময় ওই টাকা উত্তোলনের রসিদগুলি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। পাশাপাশি, কয়েকটি টাকা উত্তোলনের রসিদে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন দিলীপ কুমার দাস। তাঁর বক্তব্য, অনুমতি ছাড়া তাঁর সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
জানা গেছে, গুয়াহাটি জোনাল অফিস ছাড়াও কৈলাসহর শাখা, ধর্মনগর শাখা এবং আগরতলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও অভিযোগের প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছে।
তবে অভিযোগগুলির বিষয়ে ইউকো ব্যাঙ্কের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক সুরজিৎ মল্লিকের বক্তব্য এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা, টাকা উত্তোলনের প্রকৃত কারণ এবং সংশ্লিষ্ট নথির বৈধতা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর গ্রাহকের হিসাব পরিচালনা, ঋণ প্রক্রিয়ায় স্বাক্ষরিত রসিদের ব্যবহার এবং ব্যাংকের নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয় এবং তদন্তে প্রকৃতপক্ষে কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই নজর রয়েছে।
























