নয়াদিল্লি: ২০২৬ সালে চতুর্থবারের মতো ব্রিকসের সভাপতিত্বের দায়িত্ব নিয়েছে ভারত। ব্রিকসের কর্মসূচি মূলত তিনটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে—রাজনীতি ও নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থা এবং সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বা পিপল-টু-পিপল বিনিময়। সংঘাতপূর্ণ বর্তমান বিশ্বে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর পাশাপাশি দেশ ও দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ব্রিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পিপল-টু-পিপল বিনিময়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছিলেন, ‘মানবতাই প্রথম’—এই ভাবনাকে সামনে রেখে ভারত এই মঞ্চকে জনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ভারতের সভাপতিত্বের এবারের মূল ভাবনা—‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং স্থায়িত্বের জন্য নির্মাণ’—এই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। নেতাদের ঘোষণাপত্র প্রকাশে এখনও কিছুটা সময় বাকি থাকলেও ব্রিকসে সংস্কৃতির উপর বাড়তি গুরুত্ব আশাব্যঞ্জক।
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির মধ্যে রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক যোগাযোগ। এই অভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা পারস্পরিক সংহতি আরও বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ভারত, চিন ও রাশিয়ার কথা বলা যায়। প্রাচীন সিল্ক রুটের মাধ্যমে এই দেশগুলির মধ্যে শুধু পণ্য নয়, ধর্ম, দর্শন, জ্ঞান এবং শিল্প-সংস্কৃতিরও আদান-প্রদান ঘটেছিল। ব্রিকসের বহু দেশ ঔপনিবেশিকতা, স্বাধীনতার সংগ্রাম, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আধুনিকায়নের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ইতিহাস এক না হলেও এই অভিজ্ঞতাগুলি সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন এবং আরও প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ মিল তৈরি করেছে।
ব্রিকস দেশগুলির এই ঐতিহাসিক যোগসূত্র দেখিয়ে দেয় যে তাদের সমাজগুলির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ কোনও নতুন বিষয় নয়। পাশাপাশি, ব্রিকসের বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যেও পরিবারকেন্দ্রিক মূল্যবোধ এবং সব মানুষের সমতার ধারণা ছিল। সরকার-থেকে-সরকার সম্পর্ক যেখানে পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয়, সেখানে জনগণের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় বন্ধন তৈরির সম্ভাবনা রাখে।
ব্রিকস দেশগুলির বিপুল সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও আরও স্থিতিস্থাপক সমাজ গড়ার পথ দেখাতে পারে। কারণ, বিভিন্ন সদস্য দেশের আদিবাসী জ্ঞান ও ঐতিহ্যের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কৃষি, সামাজিক সংগঠন এবং টেকসই জীবনযাপন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশের অবক্ষয়ের মতো সমসাময়িক সমস্যার সমাধানে নতুন পথ খোঁজা সম্ভব।
এ বছর অনুষ্ঠিত ব্রিকস সিভিল ফোরাম ২০২৬-এ ব্রিকসের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৮০টি নাগরিক সমাজ সংগঠন অংশ নেয়, যার মধ্যে ভারতের ২৬টি সংগঠন ছিল। সংস্কৃতি বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—ব্রিকসের সাংস্কৃতিক সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন প্রয়োজন। তাই নিয়মিত কর্মসূচি ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে ব্রিকসের একটি পৃথক ‘কালচার ফান্ড’ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এর ফলে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা এককালীন অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি রূপ পাবে।
আলোচনায় উঠে আসা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার। দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন ও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ব্রিকস দেশগুলির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেকসই জীবনযাপনের ঐতিহ্য থেকেও সমসাময়িক সমাজ শিক্ষা নিতে পারে।
পর্যটন সাংস্কৃতিক সহযোগিতাকে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি বাস্তবসম্মত ক্ষেত্র হতে পারে। ব্রিকস দেশগুলি ঐতিহ্যবাহী পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে সংযুক্ত করে ‘কালচারাল ট্যুরিজম করিডর’ গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থান ও আয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এছাড়া জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআই, ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস এবং ই-কমার্সের সঙ্গে একটি ‘ব্রিকস ইন্টারঅ্যাকটিভ হেরিটেজ ম্যাপ’ যুক্ত করা যেতে পারে। এর ফলে স্থানীয় শিল্পী, কারিগর এবং সাংস্কৃতিক উদ্যোক্তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সহজে পৌঁছতে পারবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সাংস্কৃতিক পণ্যের পরিচিতি ও মূল্যও বাড়বে।
সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তরুণ প্রজন্ম সরাসরি সেই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। তাই ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস বা আইসিসিআর-এর কাঠামোর অধীনে ভারত বার্ষিক ‘ব্রিকস কালচার ফেস্টিভ্যাল’ আয়োজনের উদ্যোগ নিতে পারে। পাশাপাশি শিল্পী, কিউরেটর এবং গবেষকদের জন্য ‘কালচার ডিপ্লোম্যাসি ফেলোশিপ’ চালু করা যেতে পারে। নিয়মিত সাংস্কৃতিক বিনিময়, ফেলোশিপ এবং যৌথ প্রকল্প তরুণদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা না থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে। এই সহযোগিতার কেন্দ্রে নারী ও যুবসমাজকে রাখা প্রয়োজন।
ব্রিকসের মতো সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য অভিন্নতা প্রয়োজন নেই। বরং বিভিন্নতার প্রতি সম্মান জানিয়ে সংলাপ, বিনিময় এবং পারস্পরিক শিক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করাই এর শক্তি। ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং তরুণদের সাংস্কৃতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে রেখে ব্রিকস তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।
সাংস্কৃতিক সহযোগিতার একটি ধারাবাহিক, সম্প্রদায়কেন্দ্রিক এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্রিকসের সমাজগুলির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং জনকেন্দ্রিক বৈশ্বিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
তাই ব্রিকস কূটনীতিতে সংস্কৃতিকে কোনও গৌণ বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। পারস্পরিক সম্মান বাড়ানো, জনগণের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করা এবং অভিন্ন উদ্দেশ্যবোধ তৈরির ক্ষেত্রে সংস্কৃতি একটি কৌশলগত সম্পদ। ব্রিকসের ভবিষ্যৎ সংহতি শুধু বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের উপর নির্ভর করবে না; সদস্য দেশগুলি একে অপরকে কতটা বুঝতে এবং একে অপরের সংস্কৃতিকে কতটা সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরতে পারে, তার উপরও নির্ভর করবে।
সাংস্কৃতিক কূটনীতি ব্রিকসকে শুধু রাষ্ট্রগুলির অংশীদারিত্ব থেকে সমাজগুলির বৃহত্তর অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত করতে পারে। এর ফলে ব্রিকসের সহযোগিতা আরও স্থিতিস্থাপক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অর্থবহ হয়ে উঠবে।
এই আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত বিশেষভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। শত শত জীবন্ত ভাষা, হাজার হাজার উপভাষা এবং শিল্প, সংগীত, নৃত্য, বস্ত্র, খাদ্যসংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অসাধারণ বৈচিত্র্যের দেশ ভারত দীর্ঘদিন ধরেই জানে—ঐক্যের জন্য অভিন্নতা প্রয়োজন নেই। বৈচিত্র্যকে সম্মান করা হলে পার্থক্যই শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
সংস্কৃতি কোনও সমাজের স্থিতিস্থাপকতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং সামাজিক সংহতির ভিত্তি। কারণ সংস্কৃতির মধ্যেই একটি সমাজের মূল্যবোধ, পরিচয় এবং চেতনা প্রতিফলিত হয়। এতদিন ব্রিকসকে মূলত রাষ্ট্রগুলির একটি জোট হিসেবে দেখা হয়েছে। এখন সময় এসেছে ব্রিকসকে সমানভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতারও একটি জোট হিসেবে দেখার।
























