অ্যাশভিল, ৩১ আগস্ট (আইএএনএস): জ্বালানি নিরাপত্তা, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটনের উদ্যোগ—সোমবার থেকে শুরু হওয়া জি২০ অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নরদের বৈঠকে ভারতের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হতে চলেছে।
রবিবার দক্ষিণ ক্যারোলিনার গ্রিনভিল-স্পার্টানবার্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কোয়াত্রা।
ভারতের অর্থ মন্ত্রক এক্স-এ জানিয়েছে, “কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আগামী দু’দিন অ্যাশভিল, নর্থ ক্যারোলিনায় জি২০ এবং সংশ্লিষ্ট বৈঠকে অংশ নেবেন।”
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলির অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নরদের নিয়ে সোমবার ও মঙ্গলবার বৈঠকের আয়োজন করছেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। বৈঠকে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করা, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা কমানো, সার্বভৌম ঋণ সমস্যা মোকাবিলা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী করার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
ভারতের ক্ষেত্রে ইরান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, পণ্য পরিবহণ এবং বিমা খরচ বাড়লে ভারতের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং টাকার দামের উপর চাপ তৈরি হতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জি২০ দেশগুলিকে রাজি করানোর মার্কিন উদ্যোগের দিকেও নজর থাকবে নয়াদিল্লির। ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশকে এমন বাণিজ্যিক সম্পর্ক কমানোর জন্য চাপ দিতে পারে, যেগুলিকে তারা তেহরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম মাধ্যম বলে মনে করে।
ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও রয়েছে, যার মধ্যে চাবাহার বন্দর প্রকল্প অন্যতম। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে চলেছে। আমেরিকা এমন শিল্পনীতি নিয়ে জি২০-তে আলোচনা চায়, যার ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন হয় এবং বিপুল ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়।
মার্কিন আধিকারিকরা প্রকাশ্যে চিনের নাম না করলেও তাঁদের বক্তব্যে বেইজিংয়ের রফতানিনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে দীর্ঘদিনের মার্কিন উদ্বেগের প্রতিফলন রয়েছে।
কম দামের চিনা পণ্যের প্রভাব নিয়ে ভারতেরও উদ্বেগ রয়েছে। ইস্পাত, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিক্স এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম উৎপাদনের মতো দেশীয় শিল্পক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করে নয়াদিল্লি। তবে একই সঙ্গে একতরফা শুল্ক এবং সুরক্ষাবাদী পদক্ষেপের বিরোধিতাও করতে পারে ভারত, কারণ এর নেতিবাচক প্রভাব উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলির উপর পড়তে পারে।
জি২০ বৈঠক ও সংশ্লিষ্ট আলোচনাগুলিকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস করার সময় ভারতকে বিকল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে পারেন নির্মলা সীতারামন।
জি২০ বৈঠকের আগে শিকাগোতে একটি ব্যবসায়িক বৈঠকে তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে ভারতে উৎপাদন কেন্দ্র এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ব্যবসায় বিনিয়োগ, উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে ভারতের নীতিগত পরিবেশ ক্রমশ আরও উপযোগী হয়ে উঠছে।
বৈশ্বিক সংস্থাগুলিকে শুধু বৃহৎ ভোক্তা বাজার হিসেবে নয়, উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং রফতানির কেন্দ্র হিসেবে ভারতকে বিবেচনা করার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা, পরিকাঠামো, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্রতিরক্ষা এবং উন্নত প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অ্যাশভিলের বৈঠকে সার্বভৌম ঋণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ঋণ সংকটে থাকা দেশগুলির জন্য দ্রুত এবং আরও স্বচ্ছ ঋণ পুনর্গঠনের পক্ষে আগেও সওয়াল করেছে ভারত। পাশাপাশি বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান এবং বড় ঋণদাতাদের মধ্যে আরও বেশি সহযোগিতার পক্ষেও নয়াদিল্লি।
উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে পরিকাঠামো ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাঙ্কগুলির সংস্কারের পক্ষেও ভারতের অবস্থান অব্যাহত থাকতে পারে।
অ্যাশভিলে পৌঁছনোর পর এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানান, এ বছরের জি২০ ফাইন্যান্স ট্র্যাকের আয়োজক হিসেবে আমেরিকা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি ক্ষেত্রের নেতাদের একত্রিত করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
অ্যাশভিলের এই বৈঠক ডিসেম্বর মাসে মিয়ামিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের আগে ফাইন্যান্স ট্র্যাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
—আইএএনএস



















