ঢাকা, ২২ আগস্ট (আইএএনএস): গত এক মাসে বাংলাদেশে একের পর এক বিস্ফোরণ এবং বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় দেশে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের পুনরুত্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অন্তত দুটি বোমা বিস্ফোরণে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার অর্ধডজনেরও বেশি জায়গা থেকে বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রো স্টেশনের মতো ব্যস্ত যাতায়াত কেন্দ্রও রয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকায় হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রথযাত্রার মতো বড় জনসমাগমের স্থান থেকেও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। সরকারি আধিকারিকরা ঘটনাগুলির সময়কে কাকতালীয় বলে দাবি করলেও, বিভিন্ন জায়গা থেকে পরপর প্রেসার কুকার বোমা, পাইপ বোমা এবং অন্যান্য ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেই ইঙ্গিত মিলছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘ডেইলি ওয়াদা’-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঘটনাগুলিকে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের ‘পরিকল্পিত’ পুনরুত্থানের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পুনরুত্থানের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে উঠে এসেছে নব্য জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ। আফগান তালিবানের কট্টর মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মতাদর্শ অনুসরণকারী এই সংগঠনের কার্যকলাপ নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাস আগে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার পর বর্তমান পরিস্থিতির পূর্বাভাস মিলেছিল। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের নিও-জেএমবি-র সদস্য বলে চিহ্নিত করা হয়।
প্রতিবেদনটির দাবি, উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের এই পুনরুত্থান ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাপক বিক্ষোভের সময় দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, সেই সময় বাংলাদেশে অন্তত ১৭টি কারাগারে হামলা হয় এবং ২,০০০-এর বেশি বন্দি পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশোধের পরিকল্পনা করা বহু অভিজ্ঞ জঙ্গিও ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থায় শিথিলতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নিও-জেএমবি, আনসার আল-ইসলাম এবং প্যান-ইসলামপন্থী হিজবুত তাহরির-এর সদস্য-সহ গুরুতর সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত মামলায় অভিযুক্ত প্রায় ৪০০ জন জামিন পেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
‘ডেইলি ওয়াদা’-র মতে, পালিয়ে যাওয়া বন্দি এবং জামিনে মুক্ত উগ্রপন্থীদের এই সংমিশ্রণ বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলিতে অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে ফের সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলিও উচ্চঝুঁকির ব্যক্তিদের ওপর কার্যকর নজরদারি বজায় রাখতে সমস্যায় পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে তা ‘প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকারের’ বিপজ্জনক কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
এরই মধ্যে গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ সতর্ক করেছে যে, আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বাংলাদেশকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী সেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ৩৮তম প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ইসলামিক স্টেট, আল-কায়েদা এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলির বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা পরিষদের কমিটির কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লার কাছে হওয়া হামলার সঙ্গে একিউআইএস-এর যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সংগঠনটির প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে উগ্রপন্থা বৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্যেই এই সতর্কবার্তা এসেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা এবং তার আশপাশ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে প্রশাসন। মাঠপর্যায়ের পুলিশকে সতর্ক রাখা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও কঠোর করা হয়েছে।
























