আগরতলা, ২১ আগস্ট: সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের অগ্রণী নেতা ও কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আগরতলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে অনুষ্ঠিত হল সংহতি সভা। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী জীবন, কিউবার বিপ্লব এবং সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার।
বক্তব্যের শুরুতেই ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরেন তিনি। মানিক সরকার বলেন, কিউবায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগী শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ এবং শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতেই ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিপ্লবী আন্দোলনের বিকাশ ঘটে।
তিনি জানান, বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনায় ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁর সহযোগীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ফিদেল গ্রেপ্তার হন এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেই সময় আদালতে নিজের বক্তব্য নিজেই তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দীর্ঘ বক্তব্যে ফিদেল কাস্ত্রো শুধু নিজের অবস্থানই ব্যাখ্যা করেননি, বরং ভবিষ্যতের কিউবা কেমন হবে এবং জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন, তারও একটি রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন।
মানিক সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই ঐতিহাসিক বক্তব্যে ফিদেল কাস্ত্রো স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত বিচারব্যবস্থা থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবুও তিনি নিজের আদর্শ ও সংগ্রামের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। ইতিহাসই তাঁর সংগ্রামের যথার্থ মূল্যায়ন করবে—এই বিশ্বাস তাঁর মধ্যে দৃঢ় ছিল।
ফিদেল কাস্ত্রোর গ্রেপ্তারের পর কিউবার জনগণের মধ্যে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তাঁর মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মুক্তি পাওয়ার পর ফিদেল মেক্সিকোতে চলে যান এবং সেখানেই নতুন করে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন।
মেক্সিকোতে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দেন তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রো এবং আর্জেন্টিনার বিপ্লবী নেতা চে গেভারাসহ একদল বিপ্লবী। ‘গ্রানমা’ নামের নৌযানে করে তাঁরা কিউবায় প্রবেশ করেন। সেখানে পৌঁছানোর পর বাতিস্তা বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ে বিপ্লবীদের একটি বড় অংশ নিহত বা গ্রেপ্তার হলেও ফিদেল, রাউল ও তাঁদের কয়েকজন সহযোগী আত্মরক্ষা করে পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই তাঁরা গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন।
ক্রমে বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রাম তীব্রতর হয়। এক পর্যায়ে কিউবার সেনাবাহিনীর মধ্যেও বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর কিউবায় বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ফিদেল কাস্ত্রো দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
মানিক সরকার বলেন, ক্ষমতায় আসার পর ফিদেল কাস্ত্রো ভূমি সংস্কারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ভূমিহীন ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে জমি বণ্টন করা হয়। বিদেশি পুঁজির প্রভাব কমানো এবং দেশের অর্থনীতি ও সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একইসঙ্গে ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন ফিদেল।
তিনি আরও বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো শুধু কিউবার নেতা হিসেবেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। শান্তি, সার্বভৌমত্ব এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক আন্দোলনে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
মানিক সরকার বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবার্ষিকী শুধু তাঁকে স্মরণ করার উপলক্ষ নয়, তাঁর বিপ্লবী আদর্শ ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নেওয়ারও সময়। কিউবার বিপ্লব সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে বিশ্বের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মানিক সরকার বলেন, দেশের মাটিতে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনে যত সময়ই লাগুক, কৃষক ও মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সেই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সংগ্রামকে আরও তীব্র ও ধারালো করার মধ্য দিয়েই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবর্ষের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তাঁর কথায়, এই সংগ্রাম শুধু ত্রিপুরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; গোটা ভারতবর্ষেই সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
মানিক সরকার আরও বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী আদর্শ ও সংগ্রাম আগামী দিনেও শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে অনুপ্রাণিত করবে। দেশে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে মানিক সরকার বলেন, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ এবং ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ফিদেল কাস্ত্রোর জন্মশতবর্ষে তাঁর বিপ্লবী আদর্শকে স্মরণ করে এই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
শেষে কিউবার জনগণ এবং ভারতে নিযুক্ত কিউবার রাষ্ট্রদূতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংহতি জানিয়ে মানিক সরকার বলেন, ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী আদর্শ কেবল কিউবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকেও তা অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
























