নয়াদিল্লি, ১১ আগস্ট (আইএএনএস): বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন আদালতের মৌখিক পর্যবেক্ষণকে সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার ও ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার এবং তা থেকে আর্থিক লাভের অভিযোগ তুলে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলায় মঙ্গলবার নোটিস জারি করল সুপ্রিম কোর্ট।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকার, ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক, বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া এবং সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-এর কাছে জবাব চেয়েছে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ধার্য করা হয়েছে।
অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ড রাজেশ সিং চৌহানের মাধ্যমে দায়ের করা এই জনস্বার্থ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সাংবিধানিক আদালতের শুনানির সময় হওয়া কথোপকথন এবং মৌখিক পর্যবেক্ষণকে আদালতের মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাইরাল ডিজিটাল কনটেন্ট, মিম, রাজনৈতিক প্রতীক এবং আর্থিকভাবে লাভজনক অনলাইন প্রচারে পরিণত করা হচ্ছে।
আবেদনে বিশেষভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারের উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীর অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের একটি শুনানিতে করা মৌখিক পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক পরবর্তীতে ডিজিটালভাবে বাজারজাতযোগ্য কনটেন্ট, রাজনৈতিক প্রতীক, ভাইরাল উপাদান এবং অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
আবেদন অনুযায়ী, ওই প্রচার দ্রুত একটি বড় ডিজিটাল আন্দোলনের রূপ নেয়। আদালতের বক্তব্যের কিছু অংশ বেছে নিয়ে কেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং সেগুলিকে মিম ও ভাইরাল কনটেন্টে রূপান্তরিত করা হয় বলে অভিযোগ।
তবে জনস্বার্থ মামলায় স্পষ্ট করা হয়েছে, এটি বিচারব্যবস্থার সমালোচনা বা সংবিধানের ১৯(১)(এ) অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের বিরোধিতা নয়। বরং বিচারপ্রক্রিয়াকে সংগঠিতভাবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার এবং তা থেকে আর্থিক লাভের অভিযোগই এই আবেদনের মূল বিষয়।
আবেদনে বিচারপ্রক্রিয়ার মৌখিক পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে ‘সংগঠিত বাণিজ্যিক ব্যবহার’, ট্রেডমার্কের মাধ্যমে বাণিজ্যিকীকরণ, আর্থিকভাবে লাভজনক ভাইরাল প্রচার, মিমের মাধ্যমে বিকৃতি এবং অ্যালগরিদমের সাহায্যে ডিজিটাল বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরির আবেদন জানানো হয়েছে।
এছাড়াও আদালতের শুনানিতে করা মৌখিক পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে তৈরি বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত কথিত আর্থিকীকরণ, ব্র্যান্ডিং এবং ডিজিটাল প্রচারের ঘটনাগুলির তদন্তের জন্য উপযুক্ত নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত ১৫ মে একটি শুনানিতে করা মৌখিক পর্যবেক্ষণকে ঘিরে। অভিযোগ, ভুয়ো ডিগ্রির ভিত্তিতে পেশায় প্রবেশ করা ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে ওই শুনানিতে ‘পরজীবী’ এবং ‘তেলাপোকার মতো তরুণ’—এই ধরনের অভিব্যক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল।
এরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে প্রচার শুরু হয়। আবেদনকারীর দাবি, সেটি দ্রুত বড় আকারের ডিজিটাল আন্দোলনে পরিণত হয় এবং অনলাইন ব্র্যান্ডিং ও রাজনৈতিক প্রতীকের রূপ নেয়।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, আদালতের কথোপকথনকে “বেছে বেছে কেটে, মিমে রূপান্তরিত করে, অনুকরণ করে, বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে” ভাইরাল ডিজিটাল কনটেন্টে পরিণত করা হয়েছে। এই ধরনের ব্র্যান্ডিং এবং প্রচার বিচারসংক্রান্ত বিতর্কের সংগঠিত ডিজিটাল ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিতর্কের পর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট করেছিলেন, তাঁর মন্তব্য শুধুমাত্র ভুয়ো ও জাল ডিগ্রি নিয়ে পেশায় প্রবেশ করা ব্যক্তিদের উদ্দেশে করা হয়েছিল এবং দেশের তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে তা বলা হয়নি।
আবেদনে বলা হয়েছে, সাংবিধানিক আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক বিশ্বাস এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গাম্ভীর্যের উপরই আদালতের বৈধতা নির্ভর করে—অ্যালগরিদমের জনপ্রিয়তা বা অনলাইন সমর্থনের উপর নয়।
‘আউটরেজ অ্যালগরিদম’, ট্রোলিং সংস্কৃতি, মিম যুদ্ধ, আবেগনির্ভর জনমত তৈরি এবং আর্থিকভাবে লাভজনক ভাইরাল প্রচারের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে আবেদনে।
আবেদনকারীর দাবি, আদালতের গুরুত্বপূর্ণ শুনানিকে ক্রমশ ভাইরাল বিনোদন ও বাণিজ্যিক কনটেন্টে পরিণত করা হলে সাংবিধানিক আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই বিচারপ্রক্রিয়ার বাণিজ্যিক ব্যবহার ও আর্থিকীকরণ নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্টকে সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরির পাশাপাশি আদালতের মৌখিক পর্যবেক্ষণকে মূল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিকৃত বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
— আইএএনএস



















