কাঠমান্ডু, ২৫ জুলাই (আইএএনএস): ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে (মধ্য জুলাইয়ে সমাপ্ত) নেপালের রপ্তানি সর্বকালের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছালেও দেশের রপ্তানি ক্রমশ সীমিত কয়েকটি পণ্য এবং একমাত্র ভারতীয় বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পরিশোধিত ভোজ্যতেলই নেপালের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
নেপালের কাস্টমস বিভাগের প্রকাশিত বার্ষিক বৈদেশিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে দেশটির পণ্য রপ্তানি ১৩.৮ শতাংশ বেড়ে ৩১৫.২৯ বিলিয়ন নেপালি রুপিতে (এনপিআর) পৌঁছেছে, যা একটি রেকর্ড।
এর মধ্যে শুধুমাত্র পরিশোধিত সয়াবিন তেল থেকেই আয় হয়েছে ১২৮.৭৪ বিলিয়ন এনপিআর, যা মোট পণ্য রপ্তানির ৪০.৮ শতাংশ। অন্যান্য ভোজ্যতেলও যুক্ত করলে প্রাণী ও উদ্ভিজ্জ তেলজাত পণ্যের রপ্তানি দাঁড়ায় ১৪৮.৯৮ বিলিয়ন এনপিআর, অর্থাৎ মোট রপ্তানির ৪৭.৩ শতাংশ। অর্থাৎ নেপালের রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেকই এসেছে ভোজ্যতেল থেকে, যার প্রায় সম্পূর্ণটাই রপ্তানি হয়েছে ভারতে।
নেপালের ভোজ্যতেল শিল্প মূলত আর্জেন্টিনা-সহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরশীল। দেশটিতে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে সয়াবিন চাষ না হওয়ায় আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে ভারতে রপ্তানি করা হয়।
পণ্যের পাশাপাশি রপ্তানি বাজারের ক্ষেত্রেও ভারতের উপর নেপালের নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতে নেপালের রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে ২৫৮.৬৫ বিলিয়ন এনপিআর হয়েছে, যা মোট রপ্তানির ৮২ শতাংশ।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ রবিন সাইনজু আইএএনএস-কে বলেন, “এভাবে কয়েকটি পণ্য এবং একটি মাত্র বাজারের উপর নির্ভরশীলতা নেপালের রপ্তানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি। নেপালের রপ্তানি কার্যত ভারত সরকারের নীতির উপর নির্ভর করছে।”
এদিকে, ভারতের ভোজ্যতেল শিল্পও নেপাল থেকে শুল্কমুক্ত পরিশোধিত ভোজ্যতেলের আমদানি দ্রুত বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। চলতি সপ্তাহে ইন্ডিয়ান ভেজিটেবল অয়েল প্রোডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি-এর আওতায় নেপাল থেকে শুল্কমুক্ত ভোজ্যতেল আমদানির “অভূতপূর্ব বৃদ্ধি” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে।
আইভিপিএ-র দাবি, নেপালের রপ্তানি সাফটা-র ‘রুলস অব অরিজিন’ মেনে হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ নেপালে সয়াবিন ও পাম তেলের দেশীয় উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত।
রবিন সাইনজুর মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্পকে টেকসই করতে হলে নেপালকে দেশীয় পর্যায়ে আরও বেশি মূল্য সংযোজনের দিকে জোর দিতে হবে।
কাস্টমস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অর্থবর্ষে নেপাল ১৩২.৭৭ বিলিয়ন এনপিআর মূল্যের অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করে, যা পরিশোধনের পর মূলত ভারতে রপ্তানি করা হয়েছে।
ভোজ্যতেল ছাড়াও নেপাল ভারত ও বাংলাদেশে ২৯.৩২ বিলিয়ন এনপিআর মূল্যের বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে, যদিও এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ তুলনামূলকভাবে কম।
অন্যদিকে, ভারতই নেপালের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারত থেকে নেপালের আমদানির পরিমাণ ছিল ১.২১০ ট্রিলিয়ন এনপিআর, যেখানে মোট আমদানি দাঁড়ায় ২.০৯৬ ট্রিলিয়ন এনপিআর।
একই সময়ে চীনে নেপালের রপ্তানি ২৮ শতাংশ কমে ১.৮৯ বিলিয়ন এনপিআরে নেমে এলেও, চীন থেকে আমদানি ২৪.৭ শতাংশ বেড়ে ৪২৫.২৫ বিলিয়ন এনপিআরে পৌঁছেছে। ফলে চীনের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৩.৩৫ বিলিয়ন এনপিআর। অর্থাৎ, চীনে প্রতি ১ এনপিআর রপ্তানির বিপরীতে নেপালকে প্রায় ২২৫ এনপিআর মূল্যের পণ্য আমদানি করতে হয়েছে।
এছাড়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই)-র সঙ্গে বাণিজ্যেও দুর্বলতা দেখা গেছে। সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় ওই দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্যও নেপালের বিপক্ষে গেছে।


















