কৈলাসহর, ১০ জুলাই: টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে ঊনকোটি জেলার কৈলাসহর মহকুমায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। মনু নদীর উৎসাঞ্চলে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের জেরে নদীর জলস্তর চরম বিপদসীমা অতিক্রম করায় নদী সংলগ্ন বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বহু পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছেড়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গৌরনগর ব্লকের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী লাঠিয়াপুড়া এলাকায় মনু নদীর বাঁধের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহকুমা প্রশাসন, জলসম্পদ দপ্তর এবং সিভিল ডিফেন্সের স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
মহকুমাশাসক শান্তিময় দেববর্মা জানান, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কৈলাসহর মহকুমাজুড়ে মোট ১৮টি আশ্রয় শিবির চালু করা হয়েছে। সেখানে ১,১৭৭টি পরিবারের মোট ৪,৯৩৯ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রিতদের মধ্যে রয়েছেন ২,১২২ জন পুরুষ, ২,০০৩ জন মহিলা এবং ৮১৪ জন শিশু।
গত দুই দিন ধরে মহকুমাশাসক শান্তিময় দেববর্মা জলসম্পদ দপ্তরের সুপারিন্টেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার, এসডিও, অন্যান্য আধিকারিক এবং জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে চণ্ডিপুর ব্লকের শ্রীরামপুর, ছনতৈল, কৈলাসহর পুরসভার ১৩ ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ড এবং গৌরনগর ব্লকের লাঠিয়াপুড়া, রাঙ্গাউটি, কাউলিকুড়া, জলাই-সহ বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ও প্লাবিত অঞ্চল ঘুরে দেখে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৈলাসহরের পুরনো বিমানবন্দর সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব অংশে বাঁধে ফাটল ও লিকেজ ধরা পড়ায় জরুরি ভিত্তিতে মাটি ভর্তি বস্তা ফেলে এবং আর্থ ফিলিংয়ের মাধ্যমে মেরামতির কাজ শুরু হয়েছে। শহর ও সংলগ্ন নিচু এলাকাকে আরও বড় ধরনের প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
আশ্রয় শিবিরগুলিতে রান্না করা খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, শিশুদের জন্য দুধ ও পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদিকে, একটি আশ্রয় শিবিরে এক শিশুকে কুকুরে কামড়ানোর ঘটনা ঘটলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে।
মহকুমা প্রশাসন জানিয়েছে, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এনডিআরএফের প্রথম ব্যাটালিয়নের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় মনু নদীর জলস্তর পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যদিও বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে, তবুও প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, কৈলাসহর পুরপরিষদের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গাপুর এলাকায় বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে জলাবদ্ধতার কারণে বহু বাড়িতে জল ঢুকে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মনু নদীর জল নিষ্কাশনের জন্য সুইস গেট সময়মতো না খোলা এবং পাম্পের মাধ্যমে জল অপসারণ না করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় নেতাজী মেমোরিয়াল ক্লাবের সভাপতি মৃন্ময় মল্লিক দাবি করেন, ৭ ও ৮ জুলাই একাধিকবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার রণজয় দেববর্মাকে সুইস গেট খুলে পাম্পের সাহায্যে জমা জল নিষ্কাশনের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই জলাবদ্ধতা বা ‘কৃত্রিম বন্যা’ এড়ানো সম্ভব ছিল বলে তাঁর দাবি। তিনি বিষয়টি নিয়ে জেলাশাসকের কাছেও লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অন্যদিকে, গৌরনগর পঞ্চায়েত সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান তথা ঊনকোটি জেলা কংগ্রেস সভাপতি মোহাম্মদ বদরুজ্জামান অভিযোগ করেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন জিরো পয়েন্ট এলাকায় মনু নদীর বাঁধ সংস্কারে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বাঁধ সংস্কারের কথা থাকলেও বাস্তবে সেই অনুযায়ী কাজ হয়নি। ফলে নদীর জল বাড়তেই বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার তিনি মহকুমাশাসক শান্তিময় দেববর্মা, গৌরনগর ব্লকের বিডিও অঙ্কার দেব এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি বাঁধ সংস্কারের গুণগত মান এবং কাজের তদারকি নিয়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে প্রশ্ন তোলেন।
























