আগরতলা, ৩ জুলাই: একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল ভারত, উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যান আর স্মার্ট গ্রামের স্বপ্নের মাঝেও খোয়াই জেলার তেলিয়ামুড়া মহকুমার মুঙ্গিয়াকামী ব্লকের প্রত্যন্ত নোনাছড়া এডিসি ভিলেজের প্রজা বাহাদুর মলসম পাড়ার বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরও এই গ্রামের বহু পরিবারের কাছে বিশুদ্ধ পানীয় জল আজও অধরা।
গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা পাহাড়ি ছড়ার অপরিশোধিত ও ঘোলা জল। প্রতিদিন ভোর হতেই নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এমনকি শিশুরাও কলসি, বালতি ও প্লাস্টিকের পাত্র হাতে পাহাড়ের ঢালে ছুটে যান জল সংগ্রহের জন্য। কেউ পাথুরে ছড়ায় নেমে, আবার কেউ ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে বেরিয়ে আসা সরু জলধারা থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে সামান্য জল সংগ্রহ করেন। সেই জলই পানীয়, রান্না ও দৈনন্দিন সমস্ত কাজের একমাত্র অবলম্বন।
বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পাহাড়ি মাটি, পচা পাতা ও বৃষ্টির স্রোতে ছড়ার জল আরও বেশি দূষিত হয়ে পড়ে। তবুও বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে সেই জলই পান করতে হচ্ছে গ্রামবাসীদের। অনেক পরিবারের পক্ষে জল ফুটিয়ে পান করাও সম্ভব হয় না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই দূষিত জল ব্যবহার করার ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটের সংক্রমণ-সহ বিভিন্ন জলবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বহু মানুষ। শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে এই সমস্যার প্রকোপ বেশি। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবার সীমাবদ্ধতা এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসাও করাতে পারেন না।
গ্রামবাসীদের দাবি, এই সমস্যা নতুন নয়। বহুবার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবেদন, স্মারকলিপি এবং অভিযোগ জানানো হলেও আজ পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানীয় জলের কোনও স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে উন্নয়নের নানা দাবি থাকলেও মৌলিক অধিকার হিসেবে নিরাপদ পানীয় জল থেকে এখনও বঞ্চিত রয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।
গ্রামবাসীদের একটাই আবেদন, বড় বড় প্রতিশ্রুতি নয়—তাদের প্রয়োজন নিরাপদ পানীয় জলের স্থায়ী ব্যবস্থা। তাদের কথায়, “আমরা বিলাসিতা চাই না। শুধু চাই আমাদের সন্তানরা যেন দূষিত জল পান করে অসুস্থ না হয়। এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানীয় জলই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন।” নোনাছড়ার এই চিত্র শুধু একটি গ্রামের সমস্যা নয়, বরং উন্নয়নের দাবির মাঝেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিফলন। এখন দেখার, প্রশাসন এই দীর্ঘদিনের মানবিক সংকটের সমাধানে কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।



















