বড়োদরা, ৩০ জুন (আইএএনএস): গত এক দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। ২০১৪ সালে যেখানে দেশের প্রতিরক্ষা রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৩৯,০০০ কোটিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনও ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। মঙ্গলবার গুজরাটের বড়োদরায় ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাট রিজিওনাল কনফারেন্স’ (ভিজিআরসি)-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, আত্মনির্ভরতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাই আগামী দিনে বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, এক সময় ভারতের প্রতিরক্ষা চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হত। কিন্তু বর্তমানে দেশ দ্রুত প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হয়ে উঠছে।
রাজনাথ সিং বলেন, “২০১৪ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। আজ সেই উৎপাদন বেড়ে ১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে প্রতিরক্ষা রপ্তানি ১,০০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩৯,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।”
তার মতে, দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন, বেসরকারি শিল্পের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এবং স্টার্ট-আপ সংস্থাগুলির উদ্ভাবনী উদ্যোগ ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন গতি এনে দিয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, ‘আত্মনির্ভর ভারত’, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন প্রসিডিউর এবং টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের মতো সরকারি উদ্যোগ দেশীয় প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাজেটে আধুনিকীকরণ ও মূলধনী ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করছে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
তবে বর্তমান সাফল্যকে তিনি কেবল সূচনা বলেই উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, “এটাই শেষ নয়। আমাদের আরও অনেক দূর এগোতে হবে।”
গুজরাটের শিল্প পরিকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতি ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পরবর্তী ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষ করে সানন্দ ও ঢোলেরায় গড়ে ওঠা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাজনাথ সিং বলেন, “আগামী দিনের যুদ্ধ এবং অর্থনীতি—দুটিই চিপের উপর নির্ভর করবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা এবং মহাকাশ প্রযুক্তিও ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।”
তিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের আত্মনির্ভরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
“আজ বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের আত্মনির্ভরতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আমাদের সম্মিলিত সংকল্পই আগামী কয়েক দশকে বিশ্বমঞ্চে ভারতের ভূমিকা নির্ধারণ করবে,” বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্য প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, এটি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য নয়, বরং প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং সামাজিকভাবে সক্ষম ভারত গড়ার অঙ্গীকার।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাস প্রমাণ করে যে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে—অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা।
প্রতিরক্ষা খাতকে শুধু অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিকাশের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
রাজনাথ সিং বলেন, “প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিটি বিনিয়োগ শুধু দেশের নিরাপত্তাকেই শক্তিশালী করে না, পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পের অগ্রগতি, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় সমৃদ্ধির ভিত্তিও তৈরি করে।”
তিনি জানান, প্রতিরক্ষা করিডর, উৎপাদন কেন্দ্র, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং লজিস্টিক পরিকাঠামো দেশের শিল্প ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে।
সরকার প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করেছে, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) নীতিকে উদার করেছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা শিল্প করিডর গড়ে তুলেছে বলেও জানান তিনি।
‘সৃজন’ পোর্টাল, আইডেক্স, ডিফেন্স টেস্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার, গ্রিন চ্যানেল সার্টিফিকেশন এবং সেলফ-সার্টিফিকেশনের মতো সংস্কারের ফলে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) এবং স্টার্ট-আপগুলির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও তিনি জানান।
গুজরাটকে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রতিরক্ষা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, টাটা-এয়ারবাসের সি-২৯৫ সামরিক বিমান তৈরির প্রকল্প ভারতের প্রথম বেসরকারি সামরিক বিমান উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছে।
এছাড়া গুজরাটে তৈরি ‘কে-৯ বজ্র’ স্বয়ংচালিত কামানও ভারতীয় সেনার শক্তি বৃদ্ধি করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রাজ্যের রাসায়নিক, পেট্রোকেমিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, জাহাজ নির্মাণ, বন্দর, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং সবুজ হাইড্রোজেন শিল্প ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিদেশি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা প্রসঙ্গে রাজনাথ সিং স্পষ্ট করে বলেন, আত্মনির্ভর ভারতের অর্থ কখনও বিশ্বের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়।
“আমরা বিদেশি ওরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারারদের (ওইএম) সঙ্গে সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে আমাদের লক্ষ্য, এই সহযোগিতার প্রকৃত সুফল ভারতের মাটিতে এবং দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাক এবং দেশের নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে উঠুক,” বলেন তিনি।
এদিন তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ক্রমবর্ধমান মর্যাদারও প্রশংসা করেন।
রাজনাথ সিং বলেন, “এক সময় আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের বক্তব্যকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হত না। কিন্তু আজ ভারত যখন কথা বলে, তখন গোটা বিশ্ব মনোযোগ দিয়ে তা শোনে।”
তিনি এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দিয়ে বলেন, গুজরাটের মাটিতে জন্ম নেওয়া মোদিই বিশ্বদরবারে ভারতের মর্যাদা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
তিনি গুজরাটকে শুধু একটি রাজ্য নয়, বরং এক বিশেষ মানসিকতা ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। মহাত্মা গান্ধী, সর্দার বল্লভভাই পটেল এবং গুজরাটের উদ্যোক্তাদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
শিল্পপতি, স্টার্ট-আপ, এমএসএমই এবং তরুণ উদ্ভাবকদের উদ্দেশে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের শিল্পশক্তি, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে এমন পণ্য তৈরি করতে হবে, যা শুধু ভারতের চাহিদাই পূরণ করবে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এমন এক ভারত গড়া, যেখানে নকশা, গবেষণা, উন্নয়ন এবং উৎপাদন—সবই ভারতের মাটিতে হবে এবং সেই পণ্য বিশ্ববাজারে ভারতের পরিচয় বহন করবে।”


















