নয়াদিল্লি, ২২ জুন (আইএএনএস): জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য একীভূত গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। সন্ত্রাসবাদী সংগঠন এবং তাদের মদতদাতাদের ক্রমবর্ধমান ড্রোন ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীরা মনে করছেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং মানব গোয়েন্দা তথ্য (হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স)-এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। মাওবাদী দমনে সফল অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই ধরনের কৌশল জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) এক আধিকারিক জানান, মাওবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তিশালী মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ছিল অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত কার্যকর। এর ফলে মাঠপর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ, যাচাই এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
অধিকারিকদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং জম্মু-কাশ্মীরে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠনগুলি দ্রুত তাদের কৌশল বদলাচ্ছে। তারা মানব ও প্রযুক্তিগত নজরদারির সমন্বয় ঘটিয়ে নিজেদের কার্যকলাপ পরিচালনা করছে। বিশেষ করে উন্নতমানের ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা নিরাপত্তা সংস্থাগুলির উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বহু ক্ষেত্রে এই ড্রোন ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
জম্মু-কাশ্মীরে লস্কর-ই-তইবা (এলইটি)-সহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন সীমান্তে কড়া নজরদারি ও অনুপ্রবেশ রোধের ব্যবস্থা জোরদার হওয়ার পর ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাচারের পথ বেছে নিয়েছে বলে দাবি নিরাপত্তা মহলের।
অধিকারিকদের আরও দাবি, পাকিস্তানের আইএসআই-সমর্থিত চক্র জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্থানীয় যোগাযোগ তৈরি করে নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন ও অভিযান সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন ব্যবহারের বৃদ্ধি এবং কার্যকর মানব গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতিকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এক আধিকারিক বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নতি সত্ত্বেও সন্ত্রাস দমনে মাটির স্তরের তথ্যের কোনও বিকল্প নেই। ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মতো নির্ভুল অভিযানে প্রযুক্তির সক্ষমতা প্রমাণিত হলেও সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে মানব গোয়েন্দা তথ্য এখনও অপরিহার্য।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে যেভাবে উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিল, জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও একই ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বৃদ্ধির আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে। পাকিস্তানের মদতপুষ্ট কার্যকলাপের কারণে জম্মু-কাশ্মীর এখনও উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। অন্যদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতবিরোধী গোষ্ঠীগুলি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালানো এবং অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলির লক্ষ্য, যাতে কোনও ভারতবিরোধী শক্তি স্থানীয়দের প্রভাবিত বা নিজেদের নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারে।
অধিকারিকদের মতে, মানব গোয়েন্দা তথ্য শক্তিশালী করতে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলেই এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব। পাশাপাশি উন্নয়নমূলক পদক্ষেপও সমানভাবে প্রয়োজন, যাতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে অসন্তোষ না জন্মায়।
নিরাপত্তা মহলের মতে, আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। কারণ জম্মু-কাশ্মীরে পাকিস্তান-সমর্থিত গোষ্ঠী এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সক্রিয় ভারতবিরোধী শক্তিগুলি তাদের তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সেই প্রেক্ষাপটেই গোয়েন্দা ব্যবস্থার এই বৃহৎ পুনর্গঠন শুরু হতে চলেছে।



















