তিরুবনন্তপুরম, ১৯ জুন (আইএএনএস) : ‘নিউ এজ কেরল’ গড়ার লক্ষ্যে উন্নয়ন ও জনকল্যাণের সমন্বয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের সংশোধিত বাজেট পেশ করলেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী তথা অর্থমন্ত্রী ভি. ডি. সতীশন। বিধানসভায় শুক্রবার পেশ করা তাঁর প্রথম বাজেটে আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করলেও বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুই দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে এই প্রথম মন্ত্রী হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অর্থ দফতরের দায়িত্বও নিজের হাতে নিয়েছেন সতীশন। এর ফলে তিনি কেরলের সেই বিরল মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকায় স্থান পেলেন, যাঁরা মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বাজেট পেশ করেছেন। এর আগে শুধুমাত্র আর. শঙ্কর এবং উম্মেন চান্ডি এই নজির গড়েছিলেন।
রাজ্যের আর্থিক অবস্থার উপর প্রকাশিত শ্বেতপত্রের তথ্য উল্লেখ করে সতীশন বলেন, জনগণের স্পষ্ট জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার ‘নিউ এজ কেরল’ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘সুশাসন ও সহমর্মিতা’কে মূল বিষয় করে এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে, যেখানে উন্নয়ন ও জনকল্যাণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, রাজ্য বর্তমানে গুরুতর আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রাজ্যের নিজস্ব আয় অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কম এবং কেরালা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বোর্ড -এর প্রকল্পগুলির জন্য অর্থের সংস্থানও সরকারের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
সতীশনের দাবি, আগের বাজেটে কেন্দ্রের আর্থিক অংশীদারিত্বের হিসাব ভুলভাবে ধরা হয়েছিল, যার ফলে রাজ্যের ২০,৫০০ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হবে। ৩৫ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক পরিকল্পনা ব্যয়ও সেই অনুযায়ী কমানো হবে।
আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, কেএসআরটিসি বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াত চালু করা হয়েছে এবং আশা কর্মীদের সম্মানী বৃদ্ধি করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সমাজকল্যাণ পেনশন ২,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা করার পরিকল্পনাও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর দিয়ে ১০ হাজার ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ে তুলতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জমি অধিগ্রহণ ও অনুমোদন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে ‘ইনভেস্ট কেরল সেল’ গঠন করা হবে।
কোচিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি গ্লোবাল কনভেনশন সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যের চারটি বিমানবন্দরের সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সামুদ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ‘মিশন সমুদ্র’ নামে একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে। উপকূল, বন্দর এবং জলপথকে সংযুক্ত করে সড়ক, সমুদ্র ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কেরলকে ‘পোর্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভিঝিঞ্জামে জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। কোল্লাম, বেপুর ও আজিক্কাল বন্দরের উন্নয়নের পাশাপাশি একটি কেরল সামুদ্রিক নীতিও প্রণয়ন করা হবে। মেরিটাইম মিউজিয়ামের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা।
তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ বাড়িয়ে তাদের রাজ্যের মধ্যেই ধরে রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে বাজেটে। প্রয়াত উম্মেন চান্ডির নামে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রকল্প চালু করার ঘোষণা করা হয়েছে, যার আওতায় প্রতিটি পরিবার ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা পাবে।
এছাড়া একটি আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল স্টেডিয়াম এবং ‘কেরল স্কুল অব আর্কিটেকচার, প্ল্যানিং অ্যান্ড ডিজাইন’ প্রতিষ্ঠার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
বিদেশে বসবাসকারী কেরলবাসীদের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের পাঠানো অর্থ রাজ্যের অর্থনীতির মূল ভরসা হলেও ভবিষ্যতে শুধুমাত্র রেমিট্যান্স নির্ভর অর্থনীতি যথেষ্ট নয়। এবার তাঁদের সহযোগিতায় কেরলকে বিনিয়োগ-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক চাপের মধ্যেও কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি ও বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে কেরলের জন্য নতুন অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ভি. ডি. সতীশন।
।।।।।


















