ওয়াশিংটন, ৭ জুন (আইএএনএস): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান ভারতীয় বংশোদ্ভূত সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য হিন্দু পরিবার এবং তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ভারতীয়-আমেরিকান সমাজনেতারা।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘এইচইউএ সংবাদ ২০২৬’ অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষাবিদ এবং সমাজনেতারা আলোচনা করেন, কীভাবে হিন্দু দর্শন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন মানুষকে শুধুমাত্র আচার পালনের স্তর থেকে সচেতন উপলব্ধি ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরার পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য রাখেন কল্যাণ বিশ্বনাথন, যিনি আমেরিকার হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়-এর সভাপতি। পাশাপাশি ‘ফ্রম প্র্যাকটিস টু আন্ডারস্ট্যান্ডিং টু আর্টিকুলেশন: হাউ এইচইউএ নার্চারস কনফিডেন্ট হিন্দুস’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন অর্চনা শ্যামসুন্দর। অংশগ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুক্তা ত্যাগরাজন, ভারদারাজন আতুর এবং অপর্ণা ডেভ।
অর্চনা শ্যামসুন্দর বলেন, বহু হিন্দু ধর্মীয় আচার ও উপাসনা পালন করলেও তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পর্কে সবসময় অবগত থাকেন না। তাঁর মতে, এইচইউএ শিক্ষার্থীদের সেই জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেয় এবং ধর্মীয় চর্চার পেছনের কারণগুলি বুঝতে সাহায্য করে।
মুক্তা ত্যাগরাজন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২০টি কোর্স সম্পন্ন করার পর তিনি নিজের বহু পুরনো বিশ্বাসকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর কথায়, “অনেক প্রশ্ন ছিল, যেগুলি আগে কখনও জিজ্ঞাসা করিনি। এখানে এসে সেগুলির উত্তর খোঁজার সুযোগ পেয়েছি।”
মেরিল্যান্ডের অভিবাসন আইনজীবী অপর্ণা ডেভ বলেন, এইচইউএ-তে পড়াশোনার মাধ্যমে তিনি হিন্দু দর্শনের এমন অনেক দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছেন, যা আগে তাঁর অজানা ছিল। তিনি বলেন, “হিন্দুধর্মে অসাধারণ দর্শন, জ্ঞান ও বৌদ্ধিক আলোচনার ভাণ্ডার রয়েছে। এই শিক্ষাই আমাকে আমার শিকড়কে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।”
বিশ্বব্যাঙ্কের প্রাক্তন কর্মকর্তা বরদারাজন আতুরের মতে, এইচইউএ ধর্ম সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে বৌদ্ধিক অনুসন্ধানের সমন্বয় ঘটায়।
অনুষ্ঠানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে হিন্দু ঐতিহ্য ও জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। বক্তাদের মতে, সন্তানদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমে অভিভাবকদেরই শিক্ষিত হওয়া জরুরি।
মুক্তা ত্যাগরাজন বলেন, “অভিভাবকদের জন্য ধারাবাহিক হিন্দু শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সন্তানরা সংস্কৃতি, ধর্ম ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করলে তার উত্তর তাদেরই দিতে হয়।”
অপর্ণা ডেভের বক্তব্য, দ্বিতীয় প্রজন্মের ভারতীয়-আমেরিকানরা শুধু নির্দেশ নয়, যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও খোঁজে। তাই অভিভাবকদের নিজেদেরও বিষয়টি গভীরভাবে জানা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে কল্যাণ বিশ্বনাথন জানান, প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি (অ্যাক্রেডিটেশন) পাওয়ার জন্য আবেদন জমা দিয়েছে। তিনি এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, মানববিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব এখনও তুলনামূলকভাবে কম। ভবিষ্যতে শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা এবং হিন্দু সভ্যতা ও ঐতিহ্যের জ্ঞানভিত্তিক প্রতিনিধি তৈরি করাই এইচইউএ-র অন্যতম লক্ষ্য।
‘আত্মবিশ্বাসী হিন্দু’ বলতে কী বোঝায়, সেই প্রশ্নের উত্তরে মুক্তা ত্যাগরাজন বলেন, “একজন আত্মবিশ্বাসী হিন্দু হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, নিজের কর্তব্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন এবং সেই অনুযায়ী চলার সততা ও দৃঢ়তা রাখেন।”
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকা হিন্দু ঐতিহ্য, দর্শন, সংস্কৃত, যোগ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য নিবেদিত একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ডিগ্রি, সার্টিফিকেট এবং ধারাবাহিক শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করে।
























