পানিসাগর, ৪ জুন: উত্তর ত্রিপুরা জেলার পানিসাগর মহকুমার পেকুছড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে বৃহস্পতিবার আবেগঘন এক ঘটনার সাক্ষী থাকলেন এলাকার বাসিন্দারা। দীর্ঘ ৩২ বছর পর বাড়ি ফিরলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে বিপ্রজিত দাস। বহু বছর ধরে নিখোঁজ থাকা ছেলেকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা বৃদ্ধ বাবা বিজয় দাস।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বিজয় দাসের এক ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে বিপ্রজিত ছিলেন সবার বড়। আনুমানিক ১৯৯৪ সালে, মাত্র ১৪ বছর বয়সে কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে বহু খোঁজাখুঁজি করা হলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। এমনকি পানিসাগর থানায় নিখোঁজ ডায়েরিও করা হয়েছিল। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পাওয়ায় একসময় তাকে মৃত বলেই ধরে নিয়েছিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা।
বিজয় দাস জানান, গত চার বছর আগে তাঁর স্ত্রী তথা বিপ্রজিতের মা শান্তি রানী দাসের মৃত্যু হয়। এরপর থেকে তিনি একাই বাড়িতে বসবাস করছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে ছেলেকে ফিরে পেয়ে তাঁর আনন্দের সীমা নেই।
প্রথমে বাড়িতে ফিরে আসা ব্যক্তিকে চিনতে পারেননি বৃদ্ধ বাবা। তবে ছোটবেলায় কপালে কেটে যাওয়া একটি স্থায়ী দাগ দেখে নিশ্চিত হন যে তিনিই তাঁর হারিয়ে যাওয়া ছেলে বিপ্রজিত। এরপর বাবা-ছেলের আবেগঘন পুনর্মিলনের দৃশ্য উপস্থিত সকলকে আপ্লুত করে তোলে।
অন্যদিকে, বিপ্রজিত দাস জানান, ১৪ বছর বয়সে জীবিকার সন্ধানে বাড়ি ছেড়ে প্রথমে আসামে যান। পরে মুম্বাই এবং সেখান থেকে পাঞ্জাবের পাটিয়ালায় গিয়ে বিভিন্ন কাজ শিখে দীর্ঘদিন সেখানেই কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি উত্তরাখণ্ডের মুসৌরিতে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, “অনেকবার বাড়ি ফেরার কথা ভেবেছি। কিন্তু এক ধরনের অজানা ভয় ও সংকোচ আমাকে আটকে রেখেছিল। মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারছিলাম না।”
সম্প্রতি মুসৌরিতে গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ করেই পরিবারের কথা মনে পড়ে যায়। এরপর আর দেরি না করে ট্রেনে চেপে ধর্মনগরে পৌঁছান। সেখান থেকে পানিসাগর বাজারে এসে স্থানীয় গাড়িচালকদের কাছে নিজের বাবা, দাদু ও কাকার নাম-পরিচয় জানালে এক গাড়িচালক তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে সহায়তা করেন।
দীর্ঘ বছর পর বাড়ি ফিরে মাকে না পেলেও বাবা ও বোনদের সঙ্গে দেখা করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিপ্রজিত। দীর্ঘদিন ভিনরাজ্যে থাকার কারণে বাংলায় কথা বলতে কিছুটা অসুবিধা হলেও শিগগিরই মাতৃভাষায় সাবলীল হয়ে উঠবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি বাবার সঙ্গে নিজ বাড়িতেই স্থায়ীভাবে বসবাসের ইচ্ছার কথাও জানান।
৩২ বছর পর বিপ্রজিতের প্রত্যাবর্তনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামবাসীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের শত শত মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বাড়িতে ভিড় জমান। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে ফিরে পাওয়ার এই ঘটনায় পেকুছড়া গ্রামজুড়ে এখন উৎসবের আবহ বিরাজ করছে।



















