নয়াদিল্লি, ১৩ মে (আইএএনএস) : বারবার নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, ভুয়ো পরীক্ষার্থী চক্র এবং জাতীয় পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট-র কাছে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে হস্তক্ষেপের আবেদন জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে এনটিএ-কে ভেঙে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ জাতীয় পরীক্ষাকর্তৃপক্ষ গঠনের দাবিও উঠেছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত-র উদ্দেশে পাঠানো চিঠি-পিটিশনে নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে সিবিআই অথবা বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)-এর তত্ত্বাবধানে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
এই আবেদন দায়ের করেছেন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জুনিয়র ডক্টরস নেটওয়ার্কের জাতীয় মুখপাত্র ডাঃ ধ্রুব চৌহান এবং সমাজকর্মী হরিশরণ দেবগন। তাঁদের পক্ষে আইনজীবী সত্যম সিং আদালতে আবেদন জমা দেন।
পিটিশনে দাবি করা হয়েছে, বারবার প্রশ্নফাঁস, সলভার গ্যাং, ভুয়ো পরীক্ষার্থী চক্র, সাইবার নিরাপত্তার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা জাতীয় স্তরের পরীক্ষাব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে দিয়েছে।
নিট এবং এনটিএ পরিচালিত অন্যান্য পরীক্ষাকে ঘিরে অতীতের একাধিক বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবেদনকারীরা অভিযোগ করেছেন, বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণ, অপরাধ তদন্ত এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষার নিরাপত্তা ব্যবস্থার “ধারাবাহিক ভেঙে পড়া” রোখা যায়নি।
পিটিশনে নিট-ইউজি ২০২৪ এবং জেইই মেইন ২০২১-সহ একাধিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও ভুয়ো পরীক্ষার্থী চক্রের অভিযোগের উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, এই পুনরাবৃত্ত ঘটনাগুলি এনটিএ-র “প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা ও কাঠামোগত ভাঙনের” প্রমাণ।
এছাড়াও ২০২৫ সালের মার্চ মাসে রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের দেওয়া তথ্যেরও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছিল, নিট-ইউজি ২০২৪ প্রশ্নফাঁস মামলায় সিবিআই ৪৫ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পাঁচটি চার্জশিট জমা দিয়েছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের সুবিধাভোগী, ভুয়ো পরীক্ষার্থী এবং জড়িত এমবিবিএস পড়ুয়াদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
আবেদনকারীদের বক্তব্য, দেশের লক্ষ লক্ষ মধ্যবিত্ত ও আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের পড়ুয়ারা বছরের পর বছর নিটের প্রস্তুতি নেয়। বারবার প্রশ্নফাঁস শুধু তাঁদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে না, সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমান সুযোগ ও ন্যায্যতার অধিকারও ক্ষুণ্ণ করছে।
পিটিশনে বলা হয়েছে, “এই পরিস্থিতিতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ক্রমশ বিশ্বাস হারাচ্ছে যে শুধুমাত্র পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে জাতীয় পরীক্ষায় সফল হওয়া সম্ভব।”
আবেদনকারীরা এনটিএ-র পরিবর্তে বিচারিক নজরদারি, আইনি দায়বদ্ধতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ একটি “স্বাধীন, স্বচ্ছ এবং পেশাদার জাতীয় পরীক্ষাকর্তৃপক্ষ” গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের আবেদনও করা হয়েছে, যাতে জাতীয় স্তরের পরীক্ষাগুলির নিরাপদ পরিচালনার জন্য কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করা যায়।
পিটিশনে এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল প্রশ্নপত্র প্রেরণ ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক যাচাইকরণ, কড়া সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, কোচিং সেন্টার ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ারও দাবি তোলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষা নিয়ে বিতর্কের জেরে এনটিএ ৩ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা করেছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির রিপোর্টে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এনটিএ-র দাবি, বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতির উপর আস্থা রাখা সম্ভব নয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ইতিমধ্যেই গোটা বিষয়টি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রশ্নফাঁস তদন্তের পরিধি কেরল পর্যন্ত পৌঁছেছে। রাজস্থান পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ২০০ জন পড়ুয়ার সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে সিবিআই। তদন্তে উঠে এসেছে, ফাঁস হওয়া আসল প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে তৈরি একটি ‘মডেল প্রশ্নপত্র’ টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কেরল, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও বিহার-সহ বিভিন্ন রাজ্যে ২৫ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।



















