আগরতলা, ২৯ এপ্রিল : প্রকৃতির নির্মম আঘাতে বিপর্যস্ত গোটা রাজ্য। গত দুদিনের প্রবল ঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে শুধু গাছপালা উপড়ে পড়েনি, কার্যত বিপর্যস্ত হয়েছে রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর বড় অংশ। ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডের (টিএসইসিএল) প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট বলছে, রাজ্যের আটটি জেলায় মোট ১,৬৬৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে, ৭৪৫.৯৯ কিলোমিটার বিদ্যুৎ পরিবাহী কন্ডাক্টর ছিঁড়ে গিয়েছে এবং ১০৩টি ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফর্মার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫ কোটি ৫৯ লক্ষ ২৪ হাজার ৫০০ টাকা।
দক্ষিণ ত্রিপুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ৪৯৪টি পোল, ৯৬ কিলোমিটার তার এবং ১২টি ট্রান্সফর্মার নষ্ট হয়েছে। বিলোনিয়া, শান্তিরবাজার, সাব্রুম— সর্বত্র ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। সিপাহিজলায় ২৬৮টি পোল, ৬১.৭৩ কিলোমিটার তার ও ১৫টি ট্রান্সফর্মার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খোয়াইয়ে ২০৫টি পোল, গোমতীতে ১২৯টি পোল ও সর্বোচ্চ ১৯টি ট্রান্সফর্মার নষ্ট হয়েছে। উত্তর ত্রিপুরায় ১৭৩টি পোল, উনকোটিতে ৫১টি, ধলাইয়ে ৮৫টি পোল ভেঙেছে। পশ্চিম ত্রিপুরা তথা আগরতলা-কেন্দ্রিক এলাকায় ২৬০টি পোল এবং ১৮৩.৯ কিলোমিটার তার ছিঁড়ে যাওয়ায় ক্ষতির বহর সবচেয়ে বড় আকার নিয়েছে।
কিন্তু মধ্যেই নিগম বিদ্যুৎ পরিষেবা কে স্বাভাবিক করার জন্য লড়াই জারি রেখেছেন। কোথাও ঝড় থামার আগেই বিদ্যুতের তার কাঁধে নিয়ে মাঠে নামতে দেখা গেছে কর্মীদের। কোথাও গভীর রাতে বৃষ্টির মধ্যে ভেঙে পড়া পোল বদলাচ্ছেন লাইনম্যানরা। কোথাও উপড়ে পড়া গাছ সরিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ ফেরাতে কাজ করছেন ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল টিম। বহু এলাকায় কর্মীদের টানা ২৪ ঘণ্টা, কোথাও ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হয়েছে।
নিগম সূত্রের খবর, বহু জায়গায় দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা জলাবদ্ধ এলাকায় পৌঁছতে গিয়ে কর্মীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তবু পরিষেবা ফেরাতে তাঁরা পিছিয়ে যাননি। বিদ্যুৎ নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু জানিয়েছেন, এটা শুধুই রিস্টোরেশন অপারেশন নয়, এটা বিপর্যস্ত পরিষেবা কে পুনরুদ্ধার করে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই। আর এই লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছেন বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ। বিভাগ ভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট তিনি নিজে পর্যালোচনা করছেন। কোন ডিভিশনে কত পোল ভেঙেছে, কোথায় ট্রান্সফর্মার বিকল, কোথায় কত দ্রুত বিকল্প সরবরাহ সম্ভব— প্রতিটি বিষয়েই তিনি সরাসরি খোঁজ নিচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে। নিগম কর্তৃপক্ষকে তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ, গ্রাহক যেন দ্রুত পরিষেবা ফিরে পান, সেটাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
শুধু নির্দেশ নয়, মনোবলও জুগিয়েছেন মন্ত্রী। বিদ্যুৎ পরী কাঠামোর বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার বিদ্যুৎ নিগমের পাশে রয়েছে— এই আশ্বাসও তিনি দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো দ্রুত পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং প্রশাসনিক সমর্থন থাকবে বলেও তিনি নিগমকে অভয়বাণী দিয়েছেন।
বিদ্যুৎ নিগমের ব্যবস্থাপনা অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসুও কার্যত যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করে তুলতে ময়দান চষে বেড়াচ্ছেন। আধিকারিক, প্রকৌশলী এবং মাঠ পর্যায়ের টিমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে একের পর এক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন। কোথাও সাবস্টেশন, কোথাও ফিডার, কোথাও ভেঙে পড়া পোললাইন— প্রতিটি জায়গায় গিয়ে ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্র পরখ করে দ্রুত পুনরুদ্ধারের রূপরেখা তৈরি করছেন। শুধু দপ্তরে বসে তদারকি নয়, মাঠে নেমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন— এই বিষয়টি নিগমের অভ্যন্তরে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে বলেই মত কর্মীদের।
ক্ষতির আর্থিক হিসাবও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। কেবল বৈদ্যুতিক তার অর্থাৎ কন্ডাক্টর ক্ষতিতেই ব্যয় ৩ কোটি ৭২ লক্ষ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকা। ভেঙে যাওয়া বৈদ্যুতিক খুঁটি অর্থাৎ পোলে ৮৩ লক্ষ ২৫ হাজার এবং ট্রান্সফর্মার ক্ষতিতে ১ কোটি ৩ লক্ষ টাকা। সব মিলিয়ে ৫.৫৯ কোটির প্রাথমিক ক্ষতি।
কিন্তু এই বিপর্যয়ের আসল প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। আগরতলা শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম— বহু এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, পানীয় জল সরবরাহে সমস্যা, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধাক্কা, হাসপাতাল ও নিত্য পরিষেবায় বিঘ্ন— মানুষের দুর্ভোগ ছিল চরম। আর সেই দুর্ভোগ লাঘব করতেই বিদ্যুৎ নিগমের কর্মীরা আজ কার্যত মানবিক কর্তব্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ গড়ছেন।
এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় বুঝিয়ে দিয়েছে, বিদ্যুৎ শুধু একটি পরিষেবা নয়, আধুনিক জীবনের মেরুদণ্ড। আর সেই মেরুদণ্ড ভেঙে পড়লে তাকে আবার দাঁড় করাতে যাঁরা ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাত দিন লড়ে যান, সেই নিগম কর্মী, ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিকদের পরিশ্রমই আজ পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় শক্তি। দুদিন ধরে নিদারুণ কষ্টের মধ্যেও সাধারণ মানুষ যেভাবে বিদ্যুৎ কর্মীদেরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এজন্য তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং ধন্যবাদ জানিয়েছেন বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ।



















