আগরতলা, ১৫ জানুয়ারি : পার্শ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাসের থাবা পড়তেই কালবিলম্ব না করে সতর্কতা অবলম্বনে পদক্ষেপ নিয়েছে ত্রিপুরা। ত্রিপুরায় নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় রাজ্য সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে আজ সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেছেন জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন ও রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। স্বাস্থ্য দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকদের আবেদন, অযথা ভীত হবেন না এবং গুজবে কান দেবেন না। সতর্কতা মেনে চলুন এবং রাজ্য সরকারের সহযোগিতা করুন।
এদিন আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জি বি হাসপাতালের মাইক্রো বায়লোজি বিভাগের প্রধান ডা. তপন মজুমদার বলেন, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে দু’জন নার্স নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে প্রতিবেশী রাজ্য হওয়ায় ত্রিপুরাতেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তাঁর কথায়, নিপা কোনও নতুন ভাইরাস নয়। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম এই ভাইরাস ধরা পড়েছিল। এরপর ২০০১ সালে শিলিগুড়িতে এবং পরে ২০০৮ সালে আবার পশ্চিমবঙ্গে এর উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। এরপর থেকে গত কয়েক বছর ধরে কেরালায় ওই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। সাথে তিনি যোগ করেন, বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। চলতি বছর সেখানে চারজন আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
ডা. তপন মজুমদারের দাবি, চারিত্রিক দিক দিয়ে নিপা ভাইরাস কোভিড-১৯ থেকে আলাদা। কোভিডে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার অনেক বেশি। তাই বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। তাঁর কথায়, এই ভাইরাস মূলত সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত শূকর বা ঘোড়া থেকে ছড়ালেও সবচেয়ে বেশি ছড়ায় বাদুড়ের মাধ্যমে। বিশেষ করে খেজুরের কাঁচা রস নিপাহ সংক্রমণের অন্যতম বড় উৎস। তাই এই মরসুমে কাঁচা বা ফোটানো ছাড়া খেজুরের রস না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সাথে পাখি বা বাদুড়ে খাওয়া ফল, কাটা বা থুতু পড়া ফল না খাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর উপদেশ, সাধারণ ফল ভালোভাবে ধুয়ে খাবেন এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার ওপর বিশেষ জোর দেবেন।
তাঁর বক্তব্য, ভারতে নিপা ভাইরাস মানব থেকে মানব সংক্রমণের ঘটনাও দেখা গেছে। বিশেষত হাসপাতালে রোগী শনাক্ত না হলে তার সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সংক্রমণের ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়। জ্বরের সঙ্গে হঠাৎ অচেতন হয়ে যাওয়া নিপা ভাইরাসের প্রধান লক্ষণ। এছাড়াও সর্দি, কাশি থেকে শ্বাসকষ্ট, এমনকি শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে পড়তে পারে। আরটি-পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে ওই সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়। আগরতলার এজিএমসি-তে প্রাথমিক পরীক্ষা হবে এবং চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য নমুনা পুনের এনআইবি-তে পাঠানো হবে। এজিএমসি ল্যাবকে ইতিমধ্যেই বিএসএল-৩ স্তরে উন্নীত করা হয়েছে, জানান তিনি।
ডা. মজুমদার জানান, রাজ্যের সব জেলায় আইসোলেশন ওয়ার্ড চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে ২ থেকে ৪টি করে বেড রাখা হচ্ছে। জিবি হাসপাতালে রাখা হয়েছে ১০টি বেড। তাঁর দাবি, ওই সংক্রমণের চিকিত্সায় কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা না থাকলেও সময়মতো শনাক্তকরণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আনার ব্যবস্থাও করা হবে।
এদিন স্বাস্থ্য দফতরের অধিকর্তা ডা. দেবশ্রী দেববর্মা জানান, নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সোমবার সকাল থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠক করে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি ত্রিপুরায় জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের এমডির সভাপতিত্বে সকল মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ও মেডিক্যাল সুপারিন্টেনডেন্টদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে র্যাপিড রেসপন্স টিম পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে, যা ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে। জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট নিয়ে কেউ হাসপাতালে এলে তার নমুনা পরীক্ষা করা হবে। জ্বরের উপসর্গ নিয়ে কোনও মৃত্যু হলে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করা হবে। সাথে তিনি যোগ করেন, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার ও অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের এমডি সাজু ওয়াহিদ জানান, ত্রিপুরায় এখনও পর্যন্ত নিপা ভাইরাসের কোনও সংক্রমণের রেকর্ড নেই। তবুও, আগাম পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার কিট, পিপিই কিটসহ সব সরঞ্জাম মজুত রয়েছে। ওই সমস্ত সামগ্রির ঘাটতি হলে প্রয়োজনে দ্রুত সংগ্রহ করা হবে। তিনি সাধারণ মানুষকে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে জ্বর হলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। সাথে তিনি আশ্বস্ত করেছেন, বর্তমানে বিমানবন্দর বা রেলস্টেশনে কোনও ধরনের বিধিনিষেধের প্রয়োজন নেই।
এদিন ডা. তপন মজুমদার জানিয়েছেন, নিপা ভাইরাস একটি ক্যাটাগরি-৪ প্রকৃতির ভাইরাস, যা পরীক্ষার জন্য বিএসএল-৩ ল্যাব প্রয়োজন। ভারতে মূলত বাংলাদেশ প্রজাতির নিপা ভাইরাসই দেখা যায়। বাদুড় থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়, পশু থেকে সরাসরি সংক্রমণের ঘটনা বিরল। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও জাপানি এনকেফালাইটিসের মতো রোগের দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, ত্রিপুরায় বর্তমানে ২২টি অক্সিজেন প্ল্যান্ট রয়েছেন। তার মধ্যে ১২ টি বর্তমানে চালু অবস্থায় আছে। বাকি প্ল্যান্টগুলি সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের এমডি আশ্বস্ত করেছেন, পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশিকা জারি করা হবে।



















