নয়াদিল্লি, ১২ অক্টোবর — আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাওলাভি আমির খান মুত্তাকির ভারত সফর দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক মোড় ঘুরিয়ে দিল। ৯ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লিতে অবস্থানকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে তার বৈঠক এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাকিস্তানে এর প্রতিক্রিয়া যেন ভূমিকম্পের মতো—যেখানে একসময় তালিবানকে নিজেদের ‘স্ট্র্যাটেজিক গভীরতা’র অংশ হিসেবে দেখত ইসলামাবাদ, সেখানে আজ সম্পর্কের অবনতি চূড়ান্ত পর্যায়ে।
মাওলাভি আমির খান মুত্তাকি, তালিবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ১৯৭০ সালে আফগানিস্তানের হেলমন্দ প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮০’র দশকে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ নেন এবং পরে পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়ে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তালিবান কাবুল দখল করলে তিনি তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান এবং ২০০০ সালে শিক্ষা মন্ত্রী হন। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা-ভুক্ত, তার উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং সম্পদ জব্দ করা আছে। কিন্তু পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তালিবান নিষেধাজ্ঞা কমিটি তাকে ভারতে আসার জন্য বিরল ভ্রমণ ছাড়পত্র দেয়।
এই সফরের সময়, ১০ অক্টোবর জয়শঙ্কর-মুত্তাকি বৈঠকে ভারত আফগানিস্তানে স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। ভারত সম্প্রতি আফগান ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছে এবং ২০টি অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেওয়ার কথা জানিয়েছে, যার মধ্যে ৫টি মুত্তাকির হাতে তুলে দেওয়া হয়। মুত্তাকি ভারতীয় কোম্পানিগুলিকে আফগান খনিজ খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে জয়শঙ্করের পক্ষ থেকে—ভারতের কাবুলে টেকনিক্যাল মিশনকে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসে রূপান্তর করা হচ্ছে। এ সিদ্ধান্তে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত তালিবান সরকারকে কার্যত স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত কেবল রাশিয়াই তালিবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।
তালিবান-ভারত সম্পর্ক এই জায়গায় পৌঁছেছে দীর্ঘ প্রস্তুতির পর। ২০২১ সালের আগস্টে তালিবান কাবুল দখলের পরপরই ভারতের কাতার দূতাবাস তালিবান প্রতিনিধি আব্বাস স্তানিকজাইয়ের সঙ্গে বৈঠক করে। এরপর কূটনৈতিক পর্যায়ে বহুবার যোগাযোগ হয়—জে.পি. সিং কাবুলে তালিবান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মুল্লা ইয়াকুবের সঙ্গে, পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি দুবাইয়ে মুত্তাকির সঙ্গে, আর এপ্রিল ২০২৫-এ কাবুলে ভারতীয় কূটনীতিক আনন্দ প্রকাশ তালিবান নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মে ও আগস্টে জয়শঙ্কর ও মুত্তাকির মধ্যে টেলিফোনে আলাপ হয়, যেখানে ভূমিকম্প ত্রাণ ও সন্ত্রাসবাদী হামলা নিয়ে আলোচনা হয়।
এই সম্পর্কোন্নতির মূলে রয়েছে বাস্তববাদ। ভারত আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, অবকাঠামো, সংযোগ ও মানবিক সহায়তায় নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। অন্যদিকে তালিবান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বিনিয়োগের খোঁজে ভারতকে মূল্যবান মিত্র হিসেবে দেখছে।
এই সম্পর্ক পাকিস্তানের জন্য বড় ধাক্কা। একসময় যাদের কৌশলগত সহযোগী হিসেবে তালিবানকে ব্যবহার করত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, আজ সেই তালিবান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তালিবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মুল্লা ইয়াকুব প্রকাশ্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে কথা বলছেন এবং ভারতকে তালিবান সেনা প্রশিক্ষণের আহ্বান জানাচ্ছেন।
পাকিস্তান এর প্রতিক্রিয়ায় একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে—তিন মিলিয়নের বেশি আফগান শরনার্থীকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠিয়েছে। এই বিষয়টি জয়শঙ্করের বক্তব্যেও উঠে আসে, যেখানে তিনি বলেন, “জোর করে ফেরত পাঠানো আফগান শরনার্থীদের অবস্থা আমাদের গভীর উদ্বেগের বিষয়। তাদের মর্যাদা ও জীবিকা রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।”
এদিকে, তালিবান-পাকিস্তান সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুরান্ড রেখা, ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশদের টানা সীমান্ত, যা কোনো আফগান সরকারই স্বীকৃতি দেয়নি। তালিবান একে “ঔপনিবেশিক বিভাজন” হিসেবে দেখে।
পরিস্থিতির অবনতি এতটাই যে, ৯ অক্টোবর পাকিস্তান আফগানিস্তানের কাবুলে বিমান হামলা চালায়—ঠিক সেই সময় যখন মুত্তাকি দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন। বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানির মতে, পাকিস্তানের এই হামলা তাদের হতাশা ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রতিফলন।
মুত্তাকি পাকিস্তানকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, “আফগানিস্তানের মতো অন্য দেশগুলোকেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে।” তিনি দাবি করেন, তালিবান গত চার বছরে লস্কর-ই-তৈবা ও জৈশ-ই-মোহাম্মদের মতো পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে নির্মূল করেছে।
এভাবেই ভারত-তালিবান সম্পর্ক ১৯৯৯ সালের দুঃসহ স্মৃতি পেরিয়ে এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। সেই বছর তালিবান-নিয়ন্ত্রিত কন্দাহারে অপহৃত হয় একটি ভারতীয় বিমান, ১৫৫ যাত্রী-ক্রু আট দিন বন্দি ছিলেন এবং ভারত তিন জঙ্গিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। সেই ঘটনায় যে দল কাবুল গিয়েছিল, তার মধ্যে ছিলেন আজকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। সেই অতীত পেরিয়ে আজ দিল্লি ও কাবুলের মধ্যে যে নতুন কূটনৈতিক পরিসর তৈরি হচ্ছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে এক নতুন দিশায় এগিয়ে নিচ্ছে।

