নয়াদিল্লি, ৪ অক্টোবর : ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত অর্থনীতির কাতারে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ভারত। একই সঙ্গে ২০৭০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নির্গমনের অঙ্গীকারের ফলে দেশটির সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে টেকসই জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা। এই দ্বৈত লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ নয়, বরং পুরো জ্বালানি নীতিতে ‘প্রযুক্তি-নিরপেক্ষতা’-র উপর জোর দেওয়া।
ভারত ইতিমধ্যেই জ্বালানি রূপান্তরের পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম জ্বালানি ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান প্রায় ২০০ গিগাওয়াট ক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। এর মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি সবুজ শক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার দিকেই এগোচ্ছে দেশ। তবে বাস্তবতা হলো, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৭৪ শতাংশই এখনও কয়লাভিত্তিক এবং প্রাথমিক জ্বালানির ব্যবহারে কয়লার অংশীদারি প্রায় ৫৫ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও জনসংখ্যার কারণে শক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে আগামী কয়েক দশকে কয়লা, তেল ও গ্যাসকেও জ্বালানি মিশ্রণ থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে নতুন করে ৬০ গিগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠবে। ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। এই তথ্য প্রমাণ করছে যে, জ্বালানি রূপান্তর একটি সরল প্রক্রিয়া নয়—এটি নির্ভর করে ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, প্রযুক্তির প্রস্তুতি এবং সমাজের প্রয়োজনের উপর।
এই প্রেক্ষাপটে প্রাকৃতিক গ্যাস, বিশেষত এলএনজি এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি নবায়নযোগ্য শক্তির সঙ্গে সংযুক্তিকরণ সহজ করে, গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে এবং উচ্চ নির্গমনকারী খাতগুলোকে আংশিকভাবে ডিকার্বনাইজ করতে সহায়তা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ভারী ট্রাক পরিবহন খাত, যা দেশের মোট শক্তি-সম্পর্কিত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশের জন্য দায়ী, সেখানে এলএনজি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে দীর্ঘপথ ট্রাকিং বহরের এক-তৃতীয়াংশকে এলএনজি-চালিত করা হবে।
ডিজেলের তুলনায় এলএনজি ব্যবহারে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন প্রায় ৩০ শতাংশ, নাইট্রোজেন অক্সাইড ৫৯ শতাংশ এবং কণিকা পদার্থ প্রায় ৯১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস সম্ভব। যদিও এটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, তবুও স্বল্পমেয়াদে পরিবেশবান্ধব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। অন্যদিকে, স্বল্প দূরত্বের জন্য ব্যাটারি-চালিত ট্রাক ইতিমধ্যেই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে দীর্ঘ দূরত্বেও বিদ্যুতচালিত ট্রাক ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়বে।
শক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সৌর ও বায়ুশক্তি যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি এগুলো প্রকৃতিগতভাবে পরিবর্তনশীল। তাই শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তির উপর নির্ভর না করে বহুমুখী জ্বালানি পোর্টফোলিও গড়ে তোলা জরুরি। এর মধ্যে সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, শক্তি সঞ্চয়, প্রাকৃতিক গ্যাস, হাইড্রোজেন এবং নতুন প্রযুক্তি মিলিতভাবে কাজ করবে। এই বৈচিত্র্যময় শক্তি ব্যবস্থা কেবল গ্রিড নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করবে না, দীর্ঘমেয়াদি শক্তি নিরাপত্তাও গড়ে তুলবে।
বিশ্বের অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির তুলনায় ভারতের পথ আলাদা। পশ্চিমা দেশগুলো প্রথমে দূষণ বাড়িয়ে পরে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু ভারত শুরু থেকেই উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধবতার সমান্তরাল কৌশল গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ নতুন শিল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গেই টেকসই প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় ভারত শুধু উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে না, বরং একটি নতুন বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয় একটিমাত্র পথ বেছে নেওয়ায় নয়, বরং বহু প্রযুক্তিকে বিকাশের সুযোগ দেওয়ায়। প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে ভারত একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখছে, তেমনি অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

