নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১১ ডিসেম্বর৷৷ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধীতায় ত্রিপুরা বনধে পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে৷ আজ ফের একাধিক স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়েছে৷ বনধ সমর্থক ও আম জনতার মধ্যে সংঘর্ষে ৮ জন আহত হয়েছেন৷ ১ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে৷ এছাড়া, উত্তেজিত জনতাকে থামাতে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও শূন্যে গুলি ছুড়তে হয়েছে৷ একাধিক স্থানে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে৷

এদিনের বনধের জেরে কমলপুর মহকুমাতেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে৷ কমলপুর মহকুমায় হালহালি বাজারে বনধ সমর্থকরা তিনটি দোকানে ভাংচুর করেছে৷ তাতে স্থানীয় জনগণ প্রচন্ড ক্ষোব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমেছেন৷ নাকাশিপাড়ায় প্রচুর জনতা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন৷ এমনকি তাঁদের মধ্যে মারমুখি হয়ে উঠারও প্রবণতা দেখা গিয়েছিল৷ খবর পেয়ে পুলিশ ও টিএসআর ঘটনাস্থলে ছুটে যান৷ কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়ঙ্কর রূপ নিতে শুরু হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস এবং শূন্যে গুলি ছুঁড়েন৷ তাতে, উত্তেজিত জনতা ভয়ে পালিয়ে যান৷ কমলপুর মহকুমা শাসক সুশান্ত সরকার জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রনে রয়েছে৷ নাকাশিপাড়ায় উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে কাঁদানে গ্যাস ও শূন্যে ১২ রাউন্ড গুলি ছুঁড়তে হয়েছে৷
আজ সকালে খোয়াই জেলার অধীন অম্পি চৌমুহনীতে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল৷ ফলে, পুলিশ লাঠিচার্জ করে৷ উত্তেজিত জনতা পুলিশের লাঠির ভয়ে পালিয়ে যান৷ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কয়েকটি এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে মহকুমা প্রশাসন৷ তেলিয়ামুড়া মহকুমা শাসক ভাস্বর ভট্টাচার্যী জানিয়েছেন, তেলিয়ামুড়া পুর পরিষদ, মোহরছড়া, আর এস পাড়া, তুইসিন্দ্রাই, খাসিয়ামঙ্গল এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে৷
এদিন বনধের সমর্থনে পিকেটিংয়ে অংশ গ্রহণ করতে যাওয়ার সময় হাওয়াই বাড়িতে আমজনতার আক্রমণে গুরতর আহতন হন রাঙলপাড়ার বাসিন্দা মন্ত্রিলাল কাইপেং৷ গুরতর আহত অবস্থায় তাকে জিবি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়৷ কিন্তু, সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়েছে৷ এদিকে, অমরপুর মহকুমা শাসক বিনয় সিনহা জানিয়েছেন, থালছড়া এলাকায় একটি বিয়ের গাড়িতে বনধ সমর্থকরা আক্রমণ করেন৷ তাতে ওই গাড়িতে থাকা ২ জন গুরতর আহত হন৷ তাদের অমরপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ অন্যদিকে, কাঞ্চনপুর মহকুমায় কাশিরামপুর এলাকায় এক বনরক্ষী বন্ধ সমর্থকদের আক্রমণে গুরতর আহত হয়েছেন৷ ১৪৪ ধারা জারি সত্বেও বনধ সমর্থকদের ঘোড়াফেরা করতে দেখে বনরক্ষী মৃণাল কান্তি রিয়াং তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেন৷ তাতে তারা উত্তেজিত হয়ে ওই বনরক্ষীকে আক্রমণ করেন৷ তার মাথায় গুরতর আঘাত লেগেছে৷ তাকে কাঞ্চনপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷
এদিকে খোয়াই বাস স্ট্যান্ডেও উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল৷ বনধ সমর্থকরা আজ ৩টি গাড়িতে ভাংচুর করেছে৷ ওই ৩টি গাড়ি বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছিল৷ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হতে আশঙ্কায় খোয়াই মহকুমায় পদ্মবিল, বাচাইবাড়ি, বাইজলবাড়ি এবং চাম্পাহাওর এলাকায় মহকুমা প্রশাসন ৪৮ ঘন্টার জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে৷
এদিকে ধলাই জেলার আমবাসাতেও বনধের জেরে পরিস্থিতি প্রচন্ড উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে৷ বনধ সমর্থক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংঘর্ষে ৬ জন আহত হয়েছেন৷ এদিন সকালে বনধ সমর্থকরা ডলুবাড়ি এবং দেড়মাইল এলাকায় গাড়িতে ভাংচুর করেছে৷ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দুপুর দেড়টা নাগাদ আমবাসা বাজারে বনধ সমর্থকরা দোকানপাট বন্ধ করার জন্য হুমকি দেন৷ তাতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ভয় পেয়ে যান৷ জনৈক ব্যবসায়ী বলেন, তিনদিন ধরে বনধের জেরে ব্যবসা লাটে উঠেছে৷ তাই, আজ আমরা দোকান খুলেছিলাম৷ কিন্তু, বনধ সমর্থকদের হুমকির মুখে দোকান খুলে রাখার সাহস জুটাতে পারিনি আমরা৷ তিনি বলেন, এই অরাজক পরিস্থিতি আর মেনে নিতে পারছিলাম না, তাই আমবাসা বাজারে সহস্রাধিক ব্যবসায়ী মিলে বিক্ষোভ মিছিল করেছি৷
পুলিশ জানিয়েছে, আমবাসা রেল স্টেশন সংলগ্ণ আনন্দবাজারে বনধ সমর্থকরা তিনটি দোকানে লুটপাট করেছে এবং একটি দোকানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে৷ তাতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন৷ তারা রেল স্টেশনে যাওয়ার পথে চান্দ্রাইছড়া এলাকায় উত্তেজিত জনতা দুইজন বনধ সমর্থককে মারধর করেন৷ তাতেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠে৷ দুইদিক থেকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন উভয়েই৷ বনধ সমর্থক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সংঘর্ষে ৪ জন আহত হয়েছেন৷ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচুর পুলিশ ও টিএসআর বাহিনী মোতায়েন করা হয়৷ নিরাপত্তা বাহিনীকে আসতে দেখে সকলেই পালিয়ে যান৷ এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রয়েছে বলে জানিয়েছেন আমবাসা মহকুমা শাসক৷ মহকুমা জুড়ে শীগ্রই ১৪৪ ধারা জারি হতে পারে বলেও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে৷
এদিকে, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রতিবাদে ত্রিপুরায় তৃতীয় দিনেও চলছে বনধ৷ আজ সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে পিকেটাররা বনধের সমর্থনে প্রদর্শন করছেন৷ এদিকে, ত্রিপুরায় রেল পরিষেবা পুরো স্তব্ধ হয়ে পড়েছে৷ দূরপাল্লার ট্রেনের পাশাপাশি লোক্যাল ট্রেন আজও বাতিল হয়েছে৷ যানবাহন চলাচল করলেও স্বাভাবিকের তুলনায় রাস্তায় অনেক কম দেখা যাচ্ছে৷ প্রত্যন্ত এলাকায় দোকানপাট, বাজারহাটে বনধের প্রভাব পড়েছে৷ সুকল-কলেজের পরীক্ষাও বাতিল করা হয়েছে৷ স্বাভাবিকভাবেই, বনধ ত্রিপুরায় এক দমবন্ধকর অবস্থা হয়েছে৷ এরই মাঝে গুজব এড়াতে গতকাল থেকে ৪৮ ঘন্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট এবং এসএমএস পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে ত্রিপুরা সরকার৷
আজ ওই বিলের বিরোধিতায় সকালে আগরতলায় উত্তর গেইট এলাকায় অবরোধ করেন বনধ সমর্থকরা৷ জয়েন্ট মুভমেন্ট এগেইনস্ট সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট বিল (জেএমএসিএবি) সংগঠন অনির্দিষ্টকালের ত্রিপুরা বনধ পালন করছে৷ এই সংগঠনে বিভিন্ন উপজাতিভিত্তিক আঞ্চলিক দল এবং অরাজনৈতিক সংগঠন যুক্ত রয়েছে৷ গত ৯ ডিসেম্বর থেকে তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতায় ত্রিপুরায় বনধ পালন করছে৷ গতকাল বনধকে ঘিরে ত্রিপুরার বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়েছে৷
এখনো মনুঘাট এবং কাঞ্চনপুরে পরিস্থিতি থমথমে রয়েছে৷ মনুঘাটে আজ সকালে মহকুমা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে গোটা লংতরাইভ্যালিতে ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে৷ তাছাড়া, মহকুমা জুড়ে প্রচুর নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে৷ কাঞ্চনপুর মহকুমায় আনন্দবাজারে বিএসএফ নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব পালন করছে৷ তাছাড়া, কাঞ্চনপুরে অসম রাইফেলস আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ভার সামলাচ্ছে৷ অবশ্য, ত্রিপুরা পুলিশ এবং টিএসআর জওয়ানরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে৷



















