নয়াদিল্লি, ৮ অক্টোবর (আইএএনএস): প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকরের প্রয়াণে গভীর শোক নেমে এসেছে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ ও রাজনৈতিক মহলে। বৃহস্পতিবার গোয়ায় ৭৫ বছর বয়সে প্রয়াত হন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকর। তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাকৃষ্ণন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ এবং বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানি-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। সকলেই তাঁর অভিনয় প্রতিভা, বহুমুখী সৃষ্টিশীলতা এবং সমাজসেবামূলক কাজের কথা স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
গোয়ার মণিপাল হাসপাতালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডোনা পাউলার নিজের বাড়িতে নানা পাটেকরকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ শোকবার্তায় বলেন, নানা পাটেকরের মতো তীব্রতা, স্বকীয়তা এবং নিজস্ব উপস্থিতি খুব কম অভিনেতার মধ্যেই দেখা যায়। প্রতিটি চরিত্রে তিনি অসাধারণ বহুমুখিতা ও সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং এমন বহু চরিত্র উপহার দিয়েছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নানা পাটেকর তাঁর স্পষ্ট ও অকপট মতামতের জন্যও পরিচিত ছিলেন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা প্রকাশ করতে কখনও দ্বিধা করতেন না। হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। তাঁর প্রয়াণে চলচ্চিত্র জগতে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তাঁর পরিবার, বন্ধু এবং অগণিত অনুরাগীর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ‘ওম শান্তি’ বলেন।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও নানা পাটেকরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শক্তিশালী ও আবেগঘন অভিনয়ের মাধ্যমে নানা পাটেকর মানুষের জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি দর্শকদের হৃদয় ও মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, সমাজসেবার ক্ষেত্রেও নানা পাটেকরের দায়বদ্ধতা ছিল প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি তাঁর উদ্বেগ ও সহমর্মিতা ছিল স্পষ্ট। তাঁর প্রয়াণ ভারতীয় সিনেমার জন্য এক বড় ক্ষতি। তাঁর পরিবার ও অগণিত অনুরাগীর প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান রাষ্ট্রপতি।
উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাকৃষ্ণনও নানা পাটেকরের প্রয়াণে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নানা ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ও বহুমুখী শিল্পী। প্রতিটি চরিত্রে তিনি গভীরতা, সংবেদনশীলতা এবং বাস্তবতার অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটাতেন। ভারতীয় সিনেমায় তাঁর মূল্যবান অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শক্তিশালী অভিনয়ের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা আগামী প্রজন্মের চলচ্চিত্রপ্রেমীদেরও অনুপ্রাণিত করবেন বলে মন্তব্য করেন উপরাষ্ট্রপতি।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নানা পাটেকরের প্রয়াণকে শিল্পজগতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বাভাবিক অভিনয় এবং শক্তিশালী সংলাপ পরিবেশনের মাধ্যমে নানা পাটেকর দর্শকদের হৃদয়ে অমোচনীয় ছাপ রেখে গিয়েছেন। সামাজিক নাটক হোক বা কমেডি ও ব্যঙ্গ—প্রতিটি চরিত্রকেই তিনি অসাধারণ দক্ষতায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
অমিত শাহ তাঁর সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের কথাও স্মরণ করেন। বিশেষ করে ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানো এবং সীমান্তে গিয়ে সেনা জওয়ানদের মনোবল বাড়ানোর মতো কাজের উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও নানা পাটেকরের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে বলেন, তাঁর প্রয়াণ ভারতীয় সিনেমার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। অসাধারণ বহুমুখিতা এবং অভিনয়ের গভীরতার জন্য তিনি দর্শকদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন। ‘অঙ্কুশ’, ‘প্রহার’ এবং ‘ক্রান্তিবীর’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয়ের তীব্রতা ও বাস্তবতা প্রতিটি চরিত্রকে স্মরণীয় করে তুলেছিল। রাজনাথ সিং নানা পাটেকরকে ‘নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভারতীয় সিনেমায় তাঁর অবদান আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশও নানা পাটেকরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। মারাঠি ভাষায় দেওয়া বার্তায় তিনি অভিনেতার প্রয়াণকে বড় ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাঁকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে স্মরণ করেন। ফড়নবিশ বলেন, মারাঠি ও হিন্দি সিনেমায় নানা পাটেকরের অবদান দীর্ঘস্থায়ী। ‘ক্রান্তিবীর’ এবং ‘নটসম্রাট’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
ফড়নবিশও ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে নানা পাটেকরের সমাজসেবার কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, নানা নিজে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কৃষক এবং খরায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বিজেপি নেত্রী ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি আবেগঘন বার্তায় নানা পাটেকরকে ‘দাদা’ বলে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, গোটা বিশ্ব তাঁকে নানা পাটেকর নামে চিনলেও তাঁর কাছে তিনি ছিলেন ‘দাদা’। নানা পাটেকরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা স্মৃতি তুলে ধরে স্মৃতি ইরানি জানান, অভিনেতার আন্তরিকতা ও সরলতা তাঁকে সবসময় মুগ্ধ করত। এমনকি একবার নানা নিজে তাঁর জন্য রান্নাও করেছিলেন বলে জানান তিনি।
স্মৃতি ইরানি আরও বলেন, নানা পাটেকরের সঙ্গে তাঁর শেষ কথোপকথন এখনও তাঁর কানে বাজে। তিনি নানা-র সঙ্গে শীঘ্রই দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি উল্লেখ করে আবেগাপ্লুত স্মৃতি ইরানি বলেন, হয়তো সেই ‘শীঘ্রই’ আর যথেষ্ট দ্রুত ছিল না। তিনি নানা পাটেকরকে পরপারে শান্তিতে থাকার প্রার্থনা জানান।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে বিশ্বনাথ পাটেকর নামে জন্মগ্রহণ করেন নানা পাটেকর। অভিনয়ের তীব্রতা, শক্তিশালী সংলাপ পরিবেশন এবং জটিল ও ব্যতিক্রমী চরিত্রকে বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলার দক্ষতার জন্য তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতীয় চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র জায়গা করে নেন।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় তাঁর অভিষেক হয়। পরে ‘সালাম বম্বে!’ ও ‘পরিন্দা’-র মতো ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। এরপর ‘অঙ্গার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘যশবন্ত’, ‘অব তক ছাপ্পন’, ‘অপহরণ’ এবং ‘রাজনীতি’-র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে।
মারাঠি সিনেমা ও থিয়েটারেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৯১ সালে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’ ফ্র্যাঞ্চাইজিতে উদয় শেঠির চরিত্রে তাঁর কমেডি অভিনয় তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে।
‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’, ‘ওয়াজুদ’, ‘হু তু তু’, ‘গ্যাং’, ‘দিওয়ানগি’, ‘ভূত’, ‘ওয়েলকাম’, ‘ওয়েলকাম ব্যাক’, ‘নটসম্রাট’ এবং ‘দ্য ভ্যাকসিন ওয়ার’-সহ একাধিক উল্লেখযোগ্য ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৩ সালে নানা পাটেকরকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়। তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সম্মান পেয়েছেন।
শুধু অভিনয় নয়, সমাজসেবার ক্ষেত্রেও নানা পাটেকরের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। বিশেষ করে কৃষকদের সমস্যা এবং কৃষি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়াতে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে খরাপ্রবণ এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগেও অংশ নিয়েছেন তিনি।
চার দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণময় কর্মজীবনে নানা পাটেকর এমন এক অভিনয়ধারা তৈরি করেছিলেন, যেখানে শক্তিশালী সংলাপ, আবেগ, বাস্তবতা এবং চরিত্রের গভীরতা একসঙ্গে মিশে যেত। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। শিল্পী হিসেবে তাঁর সৃষ্টি এবং পর্দায় ফুটিয়ে তোলা অসংখ্য চরিত্র আগামী প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।
—আইএএনএস



















