নয়াদিল্লি, ৬ অক্টোবর (আইএএনএস): প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাহী পদে সরকারের প্রধান হিসেবে টানা ২৫ বছর নেতৃত্ব দেওয়ার মাইলফলককে অভিনন্দন জানিয়ে মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ বা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানো হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানান, গুজরাটে তিনটি বিপুল জনাদেশ এবং পরপর তিনটি লোকসভা নির্বাচনে মানুষের সমর্থনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি দীর্ঘদিন ধরে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন।
বৈষ্ণব বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশেই মানুষ একজন নেতাকে এত দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীর কাজের ধরন, সঠিক নীতি এবং স্বচ্ছ উদ্দেশ্যের কারণেই এই আস্থা তৈরি হয়েছে। মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময় থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব পর্যন্ত ধারাবাহিকতার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নাগরিকদের অভিযোগ সরাসরি শোনার জন্য গুজরাটে চালু হওয়া ‘স্বাগত’ ব্যবস্থা ২০১০ সালে রাষ্ট্রসংঘের পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। পরবর্তীতে এই অভিজ্ঞতা থেকেই ‘প্রগতি’ প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি দফতরকে একত্র করে আটকে থাকা প্রকল্পের সমস্যা সমাধান ও কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কৃষির জন্য পৃথক বিদ্যুৎ ফিডার চালুর ‘জ্যোতিগ্রাম’ মডেলও পরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনুসরণ করা হয়।
মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী মোদির দারিদ্র্য ও সাধারণ মানুষের সমস্যার প্রতি সংবেদনশীলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মায়ের দৈনন্দিন সংগ্রাম এবং দেশজুড়ে সফরের সময় মানুষের অভাব-অভিযোগ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতার সঙ্গে আবাসন, পানীয় জল, ব্যাঙ্কিং ও স্বাস্থ্য পরিষেবার বিভিন্ন প্রকল্পকে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রায় ৬০ কোটি জনধন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, চার কোটিরও বেশি বাড়ি তৈরি হয়েছে এবং ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। একইসঙ্গে প্রায় ৩.৫ কোটি মহিলা ‘লাখপতি দিদি’ হয়েছেন এবং ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’-এর মাধ্যমে মহিলাদের জন্য রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যুবসমাজের জন্য স্টার্টআপ, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পিএম-কিসান-এর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে ৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অর্থ হস্তান্তর এবং বিশেষভাবে দুর্বল আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য পিএম-জনমন-এর মতো উদ্যোগের কথাও প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জিএসটি, কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার সংস্কার এবং ঔপনিবেশিক আমলের আইন পরিবর্তনের মতো বড় সংস্কারের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং স্থানীয় পণ্য ব্যবহারের মতো বিষয়কে জনআন্দোলনে পরিণত করার প্রচেষ্টার কথাও বলা হয়েছে।
মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারি মূলধনী ব্যয় প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। একইসঙ্গে মহাসড়ক সম্প্রসারণ ও রেলপথের বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৩ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকেও আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রে জনধন, আধার ও মোবাইল সংযোগের মাধ্যমে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া, ইউপিআই-এর মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনে পরিবর্তন এবং দেশীয় কোভিড টিকা তৈরি ও চন্দ্রযান-৩-এর চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে অবতরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি এবং মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশগ্রহণের প্রসারকেও প্রধানমন্ত্রীর প্রযুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, দেশীয় টিকা উৎপাদনে সহায়তা এবং দ্রুত টিকাকরণ কর্মসূচির কথাও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়। পশ্চিম এশিয়ার সংকটের সময় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে।
২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, ২০১৯ সালের বালাকোট বিমান হামলা এবং ২০২৫ সালের অপারেশন সিঁদুরের উল্লেখ করে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘দৃঢ় নেতৃত্বের’ প্রশংসা করেছে মন্ত্রিসভা। একইসঙ্গে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ, ‘ওয়ান র্যাঙ্ক, ওয়ান পেনশন’ চালু, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ পদ সৃষ্টি, মাওবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান এবং উত্তর-পূর্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে ধরে জি২০ ও ব্রিকস-এ ঐকমত্য গড়ে তোলা, গ্লোবাল সাউথের হয়ে সরব হওয়া এবং আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি২০-তে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে। ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’র মাধ্যমে ভারতের সক্ষমতা অন্য দেশগুলির কাজে লাগানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ৩৬টি দেশের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদির সম্মান পাওয়াকেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
পরিবেশ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও গুজরাটে পৃথক জলবায়ু দফতর থেকে শুরু করে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রসার, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব, যোগ, মিলেট, কাশী বিশ্বনাথ ধাম এবং রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগের উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষে ২০৪৭ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভর ও উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্যে সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা।



















