নিউইয়র্ক, ২৭ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ভারত ও চিনের মধ্যবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক সুবিধায় পরিণত করতে চায় নেপাল। নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং চিনের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা একই কৌশলের অংশ।
নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে খানাল বলেন, ক্রমবর্ধমান ‘এশীয় শতাব্দী’-তে নেপালের সামনে এখন আর প্রশ্নটি শুধু দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর মাঝখানে কীভাবে টিকে থাকা নয়। বরং ভারত ও চিনের মধ্যে এবং তাদের বাইরেও কীভাবে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করা যায়, সেটিই নেপালের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “আমরা আমাদের উত্তর ও দক্ষিণের করিডরকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দিক হিসেবে দেখি না। আমরা দেখি, নেপাল বিশ্বের দুটি বৃহত্তম বাজারের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত, যেখানে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ বসবাস করেন।”
এই কৌশলে ভারতের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে খানাল জানান, পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের সঙ্গে নেপালের ১,৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। নেপালে উৎপাদিত পণ্যকে ভারতীয় বাজারের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে জলবিদ্যুৎকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম উৎস হিসেবে দেখছে নেপাল। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে ভারত এবং পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ রপ্তানির লক্ষ্যও রয়েছে।
অনুষ্ঠানের পর আলোচনায় ভারতের সঙ্গে নতুন নেপালি সরকারের সম্পর্ককে খানাল “অসাধারণ” বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, নিউইয়র্কে ভারতের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর ও মতবিনিময়ও হয়েছে।
খানাল বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নেপালের মোট বাণিজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভারতের সঙ্গে। বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নেপাল ভারতের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সংক্রান্ত মতপার্থক্য এবং একইসঙ্গে নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে খানাল বলেন, তাঁর সরকার বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে যেখানে অগ্রগতি সম্ভব, সেখানে সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজছে নেপাল। এ ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ইতিবাচক গতি এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চিনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে খানাল জানান, হিমালয় পেরিয়ে সড়ক যোগাযোগ আরও উন্নত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। ভারতের পর চিনকে নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিনা বিনিয়োগকারীরা নেপালের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী।
২০১৭ সালে চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ নিয়ে নেপাল একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করেছিল এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি হয়। তবে এখনও সেই চুক্তির আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়নি বলে জানান খানাল। হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষেত্রেও চিনের সহযোগিতা চাইছে নেপাল।
খানাল এই নীতিকে ‘উন্নয়ন স্বায়ত্তশাসন’ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, আগামী ১০ বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে উন্নত ও উচ্চ-আয়ের দেশে পরিণত হওয়াই নেপালের লক্ষ্য। বিদেশি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোই এর উদ্দেশ্য।
এই অর্থনৈতিক কৌশলে আমেরিকাকেও অংশীদার হিসেবে দেখছে নেপাল। খানাল বলেন, নেপাল আরও বেশি মার্কিন বিনিয়োগ চায় এবং দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে বর্তমান যোগাযোগও যথেষ্ট সক্রিয়। তবে নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান ও সংবেদনশীলতার কথা মাথায় রেখে তাঁর সরকার নিরাপত্তা জোট বা নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে না। যদিও অতীতে দুই দেশ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতা করেছে।
নেপালের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়টিকেও যুক্ত করেন খানাল। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও দুর্বল সরকারি পরিষেবার বিরুদ্ধে তরুণ নেপালিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। একইসঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি রাষ্ট্রের কার্যপ্রণালী আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
— আইএএনএস



















