বেঙ্গালুরু, ২৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি) ২০২০ শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা, পরীক্ষামূলক শিক্ষা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানালেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী। একই সঙ্গে ছোটবয়স থেকেই পড়ুয়াদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শুক্রবার বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে (আইআইএসসি) আয়োজিত ‘সেবা ফার্স্ট ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে যোশী বলেন, শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পড়ুয়াদের চাকরির জন্য প্রস্তুত করা নয়। বরং তাদের সমালোচনামূলকভাবে ভাবতে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে, নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করাই এর লক্ষ্য।
কর্ণাটকের প্রসঙ্গ তুলে যোশী অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকার এনইপি ২০২০-এর বাস্তবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। কর্ণাটকে এর আগে এনইপি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে কংগ্রেস সরকার নীতিটি থেকে সরে এসে আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি রাজ্য শিক্ষানীতি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের ১০ হাজারেরও বেশি অটল টিঙ্কারিং ল্যাবের সঙ্গে ১.১ কোটিরও বেশি পড়ুয়া যুক্ত রয়েছে। এসব ল্যাবে কাজ করে পড়ুয়ারা ইতিমধ্যে ১৬ লক্ষেরও বেশি উদ্ভাবনী প্রকল্প তৈরি করেছে।
নিজের অটল টিঙ্কারিং ল্যাব পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে যোশী বলেন, কয়েকটি স্কুলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ল্যাব তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তাঁর মতে, পড়ুয়াদের ভয় ছাড়াই এসব সুবিধা ব্যবহার এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে। কারণ তরুণদের চিন্তাভাবনা ও সমালোচনামূলক দক্ষতা বিকাশ করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে স্কুলগুলিতে আরও ৫০ হাজার অটল টিঙ্কারিং ল্যাব স্থাপনের ঘোষণা করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ১৭,৩০০-এর বেশি ইনস্টিটিউশন ইনোভেশন কাউন্সিল গড়ে তোলা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উঠে আসা বিভিন্ন উদ্ভাবনের কথাও তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এর মধ্যে আইআইটি মাদ্রাজের তৈরি ‘হোমোসাপ’ নামের রোবোটিক সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কারকারী যন্ত্র এবং কথা বলার ক্ষমতা হারানো ব্যক্তিদের কণ্ঠস্বর প্রদানে সহায়ক ‘ইলেকট্রোল্যারিংক্স’-এর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এছাড়া তামা ও অ্যালুমিনিয়ামের বাসন ব্যবহারের উপযোগী এনআইটি ওয়ারাঙ্গলের তৈরি একটি ইন্ডাকশন চুলার কথাও জানান যোশী। তাঁর মতে, এই ধরনের উদ্ভাবন ছোট বলে মনে হলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একাধিক সমস্যার সমাধান করতে পারে।
তিনি বলেন, ভারতের তরুণদের শুধু দেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যও সমাধান ও উদ্ভাবন তৈরি করতে হবে। তাঁর কথায়, “ভারতে উদ্ভাবন করুন, ভারতে তৈরি করুন, শুধু ভারতের জন্য নয়, বিশ্বের জন্যও।”
যোশী জানান, ভারতের ৬৫ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। দেশের এই তরুণ জনসংখ্যাকে তিনি উদ্ভাবন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সীমান্তবর্তী প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও তিনি কথা বলেন। তিনি জানান, স্বাস্থ্য পরিষেবা, টেকসই শহর, কৃষি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চারটি উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর জন্য মোট ১,৪৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ‘স্মার্ট ইন্ডিয়া হ্যাকাথন’-এ ১৮ লক্ষেরও বেশি পড়ুয়া অংশ নিয়েছে। সরকারি দফতর, শিল্পক্ষেত্র এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া প্রায় ৩,১৫৮টি বাস্তব সমস্যার সমাধানে তারা কাজ করেছে।
ফ্রান্সের নিস শহরে আয়োজিত ‘ভারত ইনোভেটস’ অনুষ্ঠানের কথাও উল্লেখ করেন যোশী। সেখানে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে আসা ১২০টি গভীর প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের উদ্ভাবন তুলে ধরা হয়েছিল। তিনি জানান, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপ্রধান প্রথমে উদ্ভাবনী প্রদর্শনী দেখার জন্য ২০ মিনিট সময় নির্ধারণ করলেও পরে পড়ুয়া ও অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথা বলতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করেন।
এরপর কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে একই ধরনের উদ্ভাবনী প্রদর্শনী আয়োজনের জন্য ২০টিরও বেশি অনুরোধ পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি। ভারতীয় তরুণদের দক্ষতা এবং দেশের নীতিগত স্থিতিশীলতার প্রতি বাড়তে থাকা আস্থাকেই এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন যোশী।
তিনি বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তোলার লক্ষ্য মূলত আজকের তরুণ প্রজন্মকে কেন্দ্র করেই। আগামী কয়েক দশকে দেশের উন্নয়নের সুফল তারাই ভোগ করবে।
টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রেও ভারতের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে যোশী বলেন, ৫জি প্রযুক্তি ভারতে তৈরি হয়েছে এবং ৬জি প্রযুক্তিও ভারতীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে ভারতে তৈরি স্মার্টফোনের নকশা মূলত দেশের বাইরে করা হয়। আগামী দিনে ভারতে স্মার্টফোনের নকশা ও উৎপাদন দুটিই করার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তা বিক্রির লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।



















