News Flash

  • Home
  • প্রধান খবর
  • উৎসবের মরশুমে সোনা কেনায় লাগাম টানার মোদির আবেদন, অর্থনীতি বনাম রাজনৈতিক সমীকরণের প্রশ্ন
Image

উৎসবের মরশুমে সোনা কেনায় লাগাম টানার মোদির আবেদন, অর্থনীতি বনাম রাজনৈতিক সমীকরণের প্রশ্ন

নয়াদিল্লি, ৯ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): উৎসবের মরশুমের আগে ভারতীয়দের অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে ভারতে সোনা শুধুমাত্র একটি পণ্য নয়—এটি বহু পরিবারের সঞ্চয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সম্পদ এবং গভীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। ফলে সোনা কেনাকাটায় সংযমের প্রধানমন্ত্রীর এই আবেদন একদিকে যেমন দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি বিল ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের বিষয়টি সামনে আনছে, তেমনই অন্যদিকে দেশীয় গয়না ব্যবসা এবং এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বণিক সম্প্রদায়ের উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করছে।

আগামী বছর উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, হিমাচলপ্রদেশ ও পাঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। দেশের সোনা ও গয়না ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক বণিক সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত। ফলে সোনা কেনাকাটায় দীর্ঘমেয়াদি মন্দা দেখা দিলে গয়না বিক্রিতে প্রভাব পড়তে পারে এবং নির্বাচনের আগে ওই ভোটব্যাঙ্কের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এই আবেদনের রাজনৈতিক মূল্য কতটা হবে, তা নির্ভর করবে সাধারণ মানুষ কতটা এই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন এবং গয়না ব্যবসায় এর প্রভাব কতটা পড়ছে তার উপর।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের অন্যতম কারণ হল বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনার ক্রমবর্ধমান আমদানি বিল। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারতে সোনার চাহিদা মেটাতে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। দ্য ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের সোনা আমদানি ২৪ শতাংশেরও বেশি বেড়ে রেকর্ড ৭১.৯৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যদিও একই সময়ে আমদানির পরিমাণ প্রায় ৪.৮ শতাংশ কমে প্রায় ৭২১ টনে নেমেছে।

অর্থাৎ ভারত কম পরিমাণে সোনা কিনলেও তার জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করেছে। সোনা আমদানির ফলে ডলারের চাহিদা বাড়ে। উৎসবের মরশুমে সোনা কেনার প্রবণতা আরও বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতির উপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে ভারতীয় মুদ্রা টাকার উপরও চাপ বাড়তে পারে।

তবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বৃদ্ধিকে প্রধানমন্ত্রীর আবেদনের কারণ হিসেবে দেখলে বিষয়টির সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে ভারতের আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির প্রশ্নও জড়িত। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের আগের লক্ষ্যগুলি এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধাক্কা না দিয়ে প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমানোর সুযোগ সীমিত। সেই কারণে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য আমদানির ক্ষেত্র হিসেবে সোনা স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। যদিও সোনা আমদানি কমানো দেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার মূল সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

এখানেই সোনা কেনার বিষয়টি অন্য সাধারণ ভোগ্যপণ্যের তুলনায় আলাদা। বহু ভারতীয় পরিবারের কাছে সোনা নিছক বিলাসিতা নয়, বরং সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তার একটি মাধ্যম। ফলে শুধুমাত্র সংযমের আবেদন জানিয়ে সোনার চাহিদা কমানো সহজ নয়।

ভারতে সোনা আমদানি কমাতে শুধু প্রধানমন্ত্রীর আবেদন যথেষ্ট নয়। দেশের পরিবার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে থাকা বিপুল পরিমাণ সোনাকে কীভাবে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনা যায়, সেই বিষয়েও কার্যকর নীতি প্রয়োজন। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, ভারতীয় পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে প্রায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ টন ভৌত সোনা রয়েছে। বিপুল এই সম্পদের একটি বড় অংশ এখনও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।

সরকারের গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিমও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। এর অন্যতম কারণ, বহু পরিবার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া গয়না গলিয়ে তার বিনিময়ে সুদ নিতে আগ্রহী নয়। অন্যদিকে, সোনার দামের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে চালু হওয়া সোভেরেন গোল্ড বন্ড বিনিয়োগকারীদের কাছে কিছুটা আকর্ষণীয় হলেও পরা, উপহার দেওয়া বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য কেনা গয়নার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোনার সঙ্গে যুক্ত আর্থিক বিনিয়োগ এবং পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে ব্যবহৃত গয়নার উদ্দেশ্য এক নয়। ফলে নীতিগতভাবে ভৌত সোনাকে আর্থিক সম্পদে রূপান্তরের চেষ্টা করলেও সাংস্কৃতিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে গয়নার জায়গা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবনে এমন সিদ্ধান্তের নজির রয়েছে, যেগুলি তাঁর নিজের সমর্থক গোষ্ঠীর একাংশের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছিল। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন জ্যোতিগ্রাম যোজনার মাধ্যমে কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সরবরাহকে অন্যান্য গ্রামীণ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে পৃথক করা হয়েছিল। এই উদ্যোগ কৃষকদের একাংশের বিরোধিতার মুখে পড়লেও গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছিল।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সরকার পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি চালু করে একটি একীভূত জাতীয় বাজার তৈরির চেষ্টা করে। এর ফলে বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন নিয়ম, কর কাঠামো এবং কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপ তৈরি হয়েছিল। একইভাবে, ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি কোড বা আইবিসি-ও ঋণখেলাপি সংস্থাগুলির পুরনো মালিক ও প্রোমোটারদের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে ঋণদাতাদের জন্য সংস্থার সমস্যা সমাধানের একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। তবে এর বাস্তবায়নেও একাধিক সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে।

এই পদক্ষেপগুলি প্রতিষ্ঠান, নিয়ম এবং আর্থিক প্রণোদনার ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছিল। সোনা কেনা কমানোর আবেদন তার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনও নতুন কর, ঋণনীতি বা বাধ্যতামূলক বিধি আরোপ করা হচ্ছে না। বরং সাধারণ মানুষের স্বেচ্ছা সংযমের উপর নির্ভর করছে উদ্যোগটির সাফল্য।

অর্থনীতিতে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে মানুষ তাদের সোনা কেনার সিদ্ধান্ত কতটা পরিবর্তন করছেন তার উপর। বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ কমানোর উদ্দেশ্য স্পষ্ট হলেও এই পরিবর্তন কতটা বড় এবং কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।

২০১৬ সালের নোটবন্দির সিদ্ধান্তও একটি বড় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আগে নেওয়া বড় ধরনের পরিবর্তনমূলক পদক্ষেপের উদাহরণ। তবে কোনও সিদ্ধান্ত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করলেই তা অর্থনৈতিকভাবে সফল হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।

সোনা কেনা কমানোর বর্তমান আবেদন অবশ্য নোটবন্দির মতো আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তন নয়। এখানে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে তাঁদের ব্যক্তিগত কেনাকাটার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে তার বৈদেশিক মুদ্রার খরচের বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু ঐতিহ্য, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যতে সোনার দাম বাড়ার প্রত্যাশার সঙ্গে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের এই ভারসাম্য কতটা তৈরি হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সামনে যে ঝুঁকি রয়েছে তা হল—কিছু পরিবার হয়তো সোনা কেনা পিছিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে গয়না ব্যবসায়ীদের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এমনকি কেনাকাটা কিছু সময়ের জন্য স্থগিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেই চাহিদা ফিরে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে সোনা আমদানি কমানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সীমিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর এই হস্তক্ষেপ সোনা আমদানির বৈদেশিক মুদ্রার খরচকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে এই উদ্যোগের আসল পরীক্ষা আবেদনের সাহসিকতায় নয়, বরং তা মানুষের সোনা কেনার সিদ্ধান্ত কতটা বদলাতে পারে এবং সরকার সঞ্চয়ের বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তৈরি করতে ও দেশে ইতিমধ্যেই থাকা বিপুল পরিমাণ সোনাকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে কতটা সফল হয় তার উপর। রাজনৈতিক লাভ যদি হয়, সেটি হবে এর পৃথক ফলাফল।

Releated Posts

ভারতের সীমান্ত সুরক্ষায় অরুণাচল প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে: উপরাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণন

ইটানগর, ৯ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ভারতের সীমান্ত সুরক্ষায় অরুণাচল প্রদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মন্তব্য করেছেন উপরাষ্ট্রপতি…

ByByNews Desk Sep 9, 2026

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী রেজিস্ট্রার ও ফিনান্স অফিসার নিয়োগ রাজ্যপাল আর এন রবির

কলকাতা, ৯ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে নতুন অস্থায়ী রেজিস্ট্রার ও ফিনান্স অফিসার নিয়োগ করলেন…

ByByNews Desk Sep 9, 2026

কোচবিহারে ৯০ লক্ষ টাকার সোনার বিস্কুটসহ যুবক গ্রেফতার

কলকাতা, ৯ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটা থানার সাহেবগঞ্জ এলাকায় নিয়মিত নাকা চেকিংয়ের সময় ৬৮১ গ্রামেরও বেশি…

ByByNews Desk Sep 9, 2026

পাকিস্তান সেনার প্রতি আস্থা সংকট, আসিম মুনিরের পাশে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা

নয়াদিল্লি, ৯ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা সংকটের মধ্যেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে প্রকাশ্যে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের…

ByByNews Desk Sep 9, 2026

Leave a Reply

Scroll to Top