News Flash

  • Home
  • দেশ
  • হরমুজ সংকটের পর ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত সাময়িক মোকাবিলা নয়, স্থায়ী স্থিতিস্থাপকতা
Image

হরমুজ সংকটের পর ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত সাময়িক মোকাবিলা নয়, স্থায়ী স্থিতিস্থাপকতা

নয়াদিল্লি, ৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংকট ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—শুধু বৈদেশিক মুদ্রার মজুত নয়, জ্বালানি, গ্যাস, সার, জাহাজ, বিমা ও সরবরাহ ব্যবস্থার মতো বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকেও জাতীয় নিরাপত্তার ‘দ্বিতীয় রিজার্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। লেখক মির জুনেদের মতে, চলতি বছরের সংকট মোকাবিলায় ভারতের অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ সফল হলেও, এই সাময়িক ব্যবস্থাগুলিকে এখন স্থায়ী স্থিতিস্থাপকতায় রূপান্তর করা প্রয়োজন।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। হামলার আগের দিন ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার থেকে নয় দিনের মধ্যে তা প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছয় এবং এপ্রিলের শেষে ১২৬ ডলারেরও বেশি হয়।

এর পাশাপাশি কাতার ভারতের আমদানি করা এলএনজির ৪০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহকারী গ্যাস চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ২০টিরও বেশি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ এবং প্রায় ৭৮০ জন ভারতীয় নাবিক আটকে পড়েন। আগস্ট নাগাদ সৌদি আরব থেকে ভারতে এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের খরচ চার গুণেরও বেশি বেড়ে যায়। একটি হরমুজ যাত্রার জন্য যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচ ১ কোটি ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে মে মাসের শেষ নাগাদ ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ফেব্রুয়ারির শেষের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ৪৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি কমে যায় এবং রুপি রেকর্ড নিম্নস্তরে পৌঁছয়। পরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিভিন্ন পদক্ষেপে পরিস্থিতির উন্নতি হয়।

৮ জুন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ডলার সোয়াপ সুবিধা চালু করে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ১২৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের তিন থেকে পাঁচ বছরের আমানতের মাধ্যমে। ২০১৩ সালের তুলনীয় সোয়াপ ব্যবস্থার তুলনায় এই উদ্যোগে প্রায় চার গুণ বেশি অর্থ সংগৃহীত হয়েছে।

তবে লেখকের মতে, এখানে অর্থের পরিমাণের চেয়ে ঘটনাগুলির ক্রম বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে এসেছিল বাস্তব সরবরাহের ধাক্কা, তার প্রায় তিন মাস পরে আসে ডলারের আর্থিক সুরক্ষা। সেই অর্থ চলমান অভিযোজনকে অর্থায়ন করতে পেরেছে, কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন প্রতিরোধ করতে পারেনি।

এই অভিজ্ঞতা ভারতের সামনে দুটি পৃথক ‘রিজার্ভ’-এর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে। প্রথমটি আর্থিক—ডলার, সোনা এবং ঋণসুবিধা। দ্বিতীয়টি হল বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক—জ্বালানি মজুত, জাহাজ, সরবরাহ চুক্তি, বিমা, পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং বিদেশের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, যা অর্থ থাকলেও সরবরাহ সংকটে প্রয়োজনীয় পণ্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

ভারতের প্রায় ৮৮.৭ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানিনির্ভর। যুদ্ধের আগে আমদানি করা তেলের ৪১ থেকে ৫২ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসত। দেশের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত পূর্ণ থাকলে প্রায় সাড়ে ৯ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তা ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ পূর্ণ, অর্থাৎ আনুমানিক ছয় দিনের চাহিদার সমান।

সংকটের সময় সরকার পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম মজুত, গ্যাস এবং এলপিজি-সহ বিভিন্ন উৎস মিলিয়ে প্রায় ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস এবং ৪৫ দিনের এলপিজি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিল। তবে এই মোট মজুতের কতটা জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য, তা সরকারি প্রকাশ্য তথ্য থেকে স্পষ্ট নয় বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি ছিল। জুনে ভারতের গ্যাসের চাহিদার প্রায় অর্ধেক মেটানো হচ্ছিল আমদানি করা এলএনজি দিয়ে। সার শিল্প এই গ্যাসের অন্যতম বড় ব্যবহারকারী হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ধাক্কা পড়লে ইউরিয়া উৎপাদনেও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে সংকটের সময় ভারতের দ্রুত অভিযোজনও প্রশংসনীয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হরমুজ-বহির্ভূত উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির অংশ প্রায় ৫৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার ভারতের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। জ্বালানি, সার, জাহাজ ও প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক মন্ত্রীগোষ্ঠীও কাজ শুরু করে।

এপ্রিল মাসে সরকার সমর্থিত সামুদ্রিক বিমা তহবিল অনুমোদিত হয় এবং ১২ মে প্রথম যুদ্ধঝুঁকি বিমা পলিসি জারি করা হয়। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ ওই তহবিল প্রায় ১,৬০০টি যুদ্ধঝুঁকি বিমা পলিসি দিয়েছিল এবং সংঘাতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় প্রিমিয়াম এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমেছিল।

লেখকের মতে, এই সাফল্যকে এখন দীর্ঘমেয়াদি নীতিতে পরিণত করতে হবে। এর জন্য পাঁচটি পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে—সস্তা মডেলে কৌশলগত তেল মজুত বাড়ানো, ভারত-নিয়ন্ত্রিত ট্যাঙ্কার ও গ্যাসবাহী জাহাজের নির্দিষ্ট বহর তৈরি, সার সরবরাহের জন্য স্থায়ী অগ্রাধিকার কাঠামো, একাধিক মুদ্রায় জরুরি জ্বালানি আমদানির জন্য দ্রুত পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেই নিয়মিত মহড়া ও সক্ষমতা পরিমাপের ব্যবস্থা তৈরি করা।

বিশেষ করে কৌশলগত মজুতের ক্ষেত্রে লেখক উৎপাদকদের নিজস্ব খরচে ভাড়া নেওয়া ভূগর্ভস্থ মজুতকেন্দ্র পূরণ করার মডেলের কথা বলেছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারকে প্রথম ব্যবহারের অধিকার দেওয়ার মাধ্যমে খরচ কমানো যেতে পারে বলে তাঁর মত।

এটি কোনওভাবেই আত্মনির্ভরতার নামে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রস্তাব নয়। বরং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলিতে এমন ন্যূনতম বিকল্প সক্ষমতা তৈরি করা দরকার, যাতে ৯০ দিনের মতো দীর্ঘ সরবরাহ-বিঘ্নেও দেশের কোনও গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা বন্ধ না হয়ে যায়।

লেখকের মতে, ভারতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এখন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় নিয়মিত পরিমাপ করা দরকার—কত দিনের নিশ্চিত সরবরাহ রয়েছে, কোনও নির্দিষ্ট উৎসের উপর কতটা নির্ভরতা রয়েছে এবং বিকল্প উৎসে যেতে কত সময় লাগবে।

হরমুজ সংকট দেখিয়েছে, ভারতের আর্থিক রিজার্ভ যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও বাস্তব সরবরাহ ব্যবস্থায় এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে। তাই ২০২৬ সালের সংকট মোকাবিলায় যে অস্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তা আগামী কয়েক বছরে পরিকল্পিত ও স্থায়ী সক্ষমতায় পরিণত করাই হবে ভারতের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

Releated Posts

বাডগামে ‘অপারেশন আশদার’-এ নিহত জঙ্গি পাকিস্তানি, লস্কর-ই-তৈবার সদস্য বলে শনাক্ত

শ্রীনগর, ৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): জম্মু ও কাশ্মীরের বাডগাম জেলায় শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানে নিহত জঙ্গিকে পাকিস্তানি নাগরিক…

ByByNews Desk Sep 5, 2026

জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারে ৪৮ শিক্ষকের সম্মাননা, পড়ুয়াদের কাছ থেকেও শেখার কথা স্মরণ রাষ্ট্রপতি মুর্মুর

নয়াদিল্লি, ৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): শিক্ষক দিবস উপলক্ষে শনিবার নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে দেশের ৪৮ জন শিক্ষককে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারে…

ByByNews Desk Sep 5, 2026

সহিংসতা থেকে রাজনীতিতে: ধরপাকড়ের পর খালিস্তানি গোষ্ঠীগুলিকে কৌশল বদলের নির্দেশ আইএসআইয়ের

নয়াদিল্লি, ৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বিদেশে সক্রিয় খালিস্তানপন্থী সংগঠনগুলি তাদের কর্মকৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে বলে দাবি গোয়েন্দা আধিকারিকদের। পাকিস্তানের…

ByByNews Desk Sep 5, 2026

কৃষিঋণ মকুব নিয়ে কর্নাটক বিজেপির নিশানায় শিবকুমার, কেন্দ্রকে দায় ঠেলার অভিযোগ

বেঙ্গালুরু, ৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): কৃষকদের ঋণ মকুবের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে…

ByByNews Desk Sep 5, 2026

Leave a Reply

Scroll to Top