নয়াদিল্লি, ৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): বিদেশে সক্রিয় খালিস্তানপন্থী সংগঠনগুলি তাদের কর্মকৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে বলে দাবি গোয়েন্দা আধিকারিকদের। পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই)-এর সরাসরি নির্দেশে এই সংগঠনগুলি সহিংস অপরাধমূলক কার্যকলাপ থেকে সরে রাজনৈতিক প্রচার ও কর্মসূচির দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির ধরপাকড় এড়াতেই এই কৌশলগত পরিবর্তন বলে মনে করছেন আধিকারিকরা।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, খালিস্তান ইস্যুতে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয় বাড়ায় বিদেশে সক্রিয় এই গোষ্ঠীগুলির উপর চাপও বেড়েছে। এতদিন সহিংসতা, তোলাবাজি, মাদক পাচার, অর্থপাচার এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা সম্ভব হচ্ছিল। সেই পরিস্থিতিতে আইএসআই এখন সংগঠনগুলিকে প্রকাশ্যে গ্যাংস্টারদের সঙ্গে যোগাযোগ না রেখে আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে দাবি এক গোয়েন্দা আধিকারিকের।
এক আধিকারিক বলেন, আইএসআই খালিস্তানপন্থী সংগঠন, বিশেষ করে সিখস ফর জাস্টিস (এসএফজে)-কে প্রাসঙ্গিক ও সক্রিয় রাখতে চায়। সেই লক্ষ্যেই গণভোট, মিছিল এবং পঞ্জাবকে পৃথক খালিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবির মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।
গোয়েন্দা আধিকারিকদের মতে, খালিস্তান আন্দোলন ঐতিহাসিকভাবে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পঞ্জাবে এই আন্দোলনের জেরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে সেই সশস্ত্র আন্দোলন কার্যত দমন করা হয়। ফলে বর্তমানে পঞ্জাবে সহিংসতার অতীতের কারণে এই আন্দোলন বিশেষ জনসমর্থন পাচ্ছে না বলেই মনে করছেন তাঁরা।
এক আধিকারিকের বক্তব্য, আইএসআই এখন চাইছে পঞ্জাবের মানুষ খালিস্তানপন্থী আন্দোলনকে সহিংসতার বদলে শিখদের অধিকার আদায়ের একটি রাজনৈতিক দাবি হিসেবে দেখতে শুরু করুক। এর মাধ্যমে আন্দোলনকে নতুন করে জনসমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি গোয়েন্দা সূত্রের।
এই প্রসঙ্গে গত ১৬ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা প্রদেশের ইন্ডিয়ানাপোলিসে এসএফজে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের কথাও উল্লেখ করেছেন এক আধিকারিক। রিচার্ড জি. লুগার প্লাজায় আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানকে ‘পঞ্জাব ইন্ডিপেন্ডেন্স রেফারেন্ডাম’ হিসেবে প্রচার করা হয়। সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং দীর্ঘ লাইন দেখা গিয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
গোয়েন্দা আধিকারিকদের মতে, ওই অনুষ্ঠানের কোনও সাংবিধানিক বা আইনি কর্তৃত্ব না থাকলেও এমন কর্মসূচি এসএফজে-কে আন্তর্জাতিক স্তরে জনসমর্থনের একটি ধারণা তৈরি করার সুযোগ দেয়। তাঁদের আশঙ্কা, এই ধরনের কর্মসূচি খালিস্তানপন্থী আন্দোলনকে নতুন রাজনৈতিক বয়ান দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সূত্রের আরও দাবি, ভবিষ্যতে এসএফজে এবং অন্যান্য খালিস্তানপন্থী সংগঠনগুলি ভারতবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য, ভারতে হামলার আহ্বান কিংবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার মতো প্রকাশ্য ডাক এড়িয়ে চলতে পারে। আধিকারিকদের বক্তব্য, হিংসাত্মক অপরাধের আহ্বানকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা বৈধ রাজনৈতিক অভিব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ইন্ডিয়ানাপোলিসের ওই অনুষ্ঠানে এসএফজে তথাকথিত ‘ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব খালিস্তান’-এর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রাজধানী হিসেবে শিমলার নাম ঘোষণা করে। এসএফজে প্রধান গুরপতবন্ত সিং পান্নুন ভারত সরকারের বিরুদ্ধে শিখ সম্প্রদায়ের স্বার্থবিরোধী নীতি গ্রহণের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জনসংখ্যাগত—বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিখ সম্প্রদায় চাপের মুখে রয়েছে।
গোয়েন্দা আধিকারিকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য এবং কর্মসূচি খালিস্তানপন্থী গোষ্ঠীগুলির কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তাঁদের দাবি, সহিংসতার বদলে আইনি ও রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যে থেকে আন্দোলনকে সক্রিয় রাখাই এখন মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে ভারতের পাশাপাশি বিদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলির নজর এড়িয়ে খালিস্তানপন্থী বয়ানকে পঞ্জাব এবং প্রবাসী শিখদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
—আইএএনএস



















