কলকাতা, ৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে এবার কলকাতায় বড়সড় সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিকল্পনা করছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পুজোর সময় একাধিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ড্রোন শো, কনসার্ট-সহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আগামী সোমবার একটি মেগা বৈঠক করবে রাজ্য সরকার।
রাজ্য সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়া থেকে ১৯ অক্টোবর অষ্টমী পর্যন্ত কলকাতায় নজিরবিহীন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালিদের সঙ্গে কলকাতার দুর্গাপুজোর যোগসূত্র আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
পরিকল্পিত আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হতে পারে কলকাতার আকাশে একসঙ্গে ৩ হাজার ড্রোনের প্রদর্শনী। আলোর বিন্দুর মাধ্যমে আকাশে দেবী দুর্গার ছবি ফুটিয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সোমবারের বৈঠকের পর বিভিন্ন কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন এক রাজ্য সরকারি আধিকারিক।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালিদের কলকাতার দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত করতে পর্যটন দফতর বিশেষ একটি কর্মসূচিও প্রস্তুত করছে। ‘বিশ্বজুড়ে বাঙালিদের আবেগ – দুর্গাপূজা গ্লোবাল কানেক্ট ২০২৬’ নামে এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসী বাঙালিদের উৎসবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়া কলকাতার দুর্গাপুজোকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে রাজ্য সরকার। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অভিজ্ঞ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রকল্পের জন্য রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) জারি করা হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর মহালয়ার দিন ইডেন গার্ডেন্সে বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ঐতিহ্যবাহী মহিষাসুরমর্দিনী পরিবেশনের পাশাপাশি বাংলার লোক ও শাস্ত্রীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারার অনুষ্ঠান থাকবে। সন্ধ্যায় জনপ্রিয় শিল্পীদের নিয়ে একটি মেগা কনসার্ট আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে ঢাক বাজানোর মাধ্যমে বিশ্বরেকর্ড গড়ার প্রচেষ্টাও করা হতে পারে।
অষ্টমীর দিনও থাকছে বিশেষ আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচের পাশাপাশি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও স্থাপত্য নিদর্শনগুলিকে বিশেষ আলোকসজ্জায় সাজানোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে সরকারি ভবনে শুধুমাত্র স্থাপত্যভিত্তিক আলোকসজ্জার অনুমতি থাকবে। বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনও মঞ্চ তৈরি বা স্থাপন করা যাবে না বলেও নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে।
পরিকল্পনায় একটি বড় স্টেডিয়াম বা অডিটোরিয়ামে চার ঘণ্টার ‘গ্র্যান্ড দুর্গাপুজো কনসার্ট’ আয়োজনের কথাও রয়েছে। সেখানে ঢাক ও ধুনুচি নাচের পাশাপাশি ছৌ, বাউল, ঝুমুর, কীর্তন, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নেপালি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা স্থান পাবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলার দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য তুলে ধরতে বাংলার হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং কলকাতার বিখ্যাত থিম প্যান্ডেলগুলিকেও প্রচারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে আয়োজন যতই বড় হোক, দুর্গাপুজোর ধর্মীয় পবিত্রতা ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি যাতে কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার। প্রয়োজন হলে পুরোহিত, ধর্মীয় আচার-বিশেষজ্ঞ এবং হেরিটেজ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হবে।
পরিবেশবান্ধব ভাবেও গোটা আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন, বর্জ্য পৃথকীকরণ, ডিজিটাল আমন্ত্রণপত্র এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মতো একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা রয়েছে। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগকে প্রতিবছরের আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার।
রাজ্য সরকারি আধিকারিকের বক্তব্য, দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতিনীতি অক্ষুণ্ণ রেখেই বাংলার সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে রাজ্যের অর্থনীতিতে যে বড় ভূমিকা তৈরি হয়, তার প্রসার ঘটানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বাংলায় আকৃষ্ট করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
—আইএএনএস
























