নয়াদিল্লি, ১১ আগস্ট (আইএএনএস): প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংকে ইতিহাস ‘নিঃসন্দেহে সদয়ভাবেই’ মনে রাখবে এবং তিনি ছিলেন শান্ত, বিনয়ী, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রধানমন্ত্রী—মঙ্গলবার এমনই মন্তব্য করলেন কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির (সিপিপি) চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী।
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ লেখা একটি কলামে সোনিয়া গান্ধী বলেন, ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ, যদিও উপেক্ষিত দিন ছিল। ওই দিন এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট তথাকথিত ‘কয়লা ব্লক বরাদ্দ কেলেঙ্কারি’ মামলায় ড. মনমোহন সিংকে দেওয়া সিবিআইয়ের ক্লিনচিট বহাল রাখে। একইসঙ্গে, সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ না করা এবং ‘কোনও জোরালো কারণ ছাড়াই’ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করার জন্য ট্রায়াল কোর্টকে ভর্ৎসনা করে শীর্ষ আদালত।
সোনিয়া গান্ধীর অভিযোগ, ড. মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে প্রচার পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত ছিল। তাঁর কথায়, “ড. সিংয়ের বিরুদ্ধে এই অভিযান আমাদের জনপরিসরের আলোচনার অন্যতম করুণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। অসাধারণ সততা ও নৈতিকতার অধিকারী এই মানুষটির বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করা হয়েছিল।”
এই প্রচারের সঙ্গে আমলাতন্ত্র, সংবাদমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, নাগরিক সমাজ এবং অবশ্যই আরএসএস ও বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষ জড়িত ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সোনিয়া বলেন, শেষ পর্যন্ত এই ‘ভিত্তিহীন অভিযান’ শূন্যতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই ড. মনমোহন সিং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেছেন। তাঁর মতে, ড. সিংয়ের সততা ও জবাবদিহির রেকর্ডের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাজের বড় পার্থক্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অপরাধ ও দুর্নীতির তদন্তের জন্য তৈরি ইডি ও সিবিআইয়ের মতো সংস্থাগুলিকে মোদি সরকার স্পষ্টভাবেই অপব্যবহার করেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিরোধী দলে থাকলে কাউকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা হচ্ছে, আবার দলবদল করে বিজেপিতে যোগ দিলেই সেই অভিযোগ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক নেতাদের উপর চাপ তৈরি করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। কাউকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার কাউকে বিজেপিতে সামিল করা হচ্ছে। এমনকী কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের মন্ত্রীও করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সোনিয়া।
ড. মনমোহন সিংকে আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও অন্যতম সরব ব্যক্তি ছিলেন বলে দাবি করেন সোনিয়া। ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজ্যসভায় মনমোহন সিংকে নিয়ে মোদির করা ‘রেইনকোট পরে স্নান করার কৌশল’ সংক্রান্ত মন্তব্যের উল্লেখ করে তিনি সেটিকে সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম নিম্নতম মুহূর্ত বলে অভিহিত করেন।
সোনিয়া বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যখন আজকাল ভারতের ছাত্রদের তাঁকে আক্রমণ করার জন্য ‘ক্ষমা’ করছেন, তখন হয়তো এই সুযোগে ড. সিংকে নিয়ে নিজের অমর্যাদাকর কটূক্তির জন্য নিজেকেও ক্ষমা করতে পারেন।”
ড. মনমোহন সিংয়ের সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন সোনিয়া। তাঁর দাবি, মনমোহন সিংয়ের সরকার নজিরবিহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভোগব্যয় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের উত্থানের মাধ্যমে ভারতে গভীর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। এর ফলে ভারত মধ্যম আয়ের দেশগুলির সারিতে উঠে আসে।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনীতি যখন প্রবল অস্থিরতা ও সংকটের মুখে পড়েছিল, তখন ভারত তার অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা প্রমাণ করেছিল। মনমোহন সিংয়ের আমলে কর্মসংস্থানের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছিল এবং বহু মানুষ উচ্চ উৎপাদনশীল পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
সোনিয়া আরও বলেন, আগের সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ত্বরান্বিত গতির উপর ভিত্তি করে ভারত দারিদ্র্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছিল। তাঁর দাবি, ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হিসাবের পদ্ধতি পরিবর্তন করা হলেও ইউপিএ সরকারের ১০ বছরে আগের ১২ বছরের তুলনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল এবং এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।
সামাজিক ক্ষেত্রেও মনমোহন সিংয়ের সরকার ‘একটি বিপ্লব’ ঘটিয়েছিল বলে দাবি করেন সোনিয়া। তাঁর মতে, শিক্ষা অধিকার আইন, কেন্দ্রীয় অর্থপুষ্ট উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওবিসি সংরক্ষণ এবং বনাধিকার আইন প্রণয়নের মতো পদক্ষেপ সামাজিক ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করেছিল।
মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন (এমজিএনআরইজিএ) এবং জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর কথাও উল্লেখ করেন সোনিয়া। তাঁর দাবি, কোভিড-১৯ মহামারির সময় অর্থনীতি যখন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল, তখন দরিদ্র ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এমজিএনআরইজিএ। অন্যদিকে, জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন কোটি কোটি পরিবারের জন্য মৌলিক খাদ্যশস্যের অধিকার নিশ্চিত করেছিল।
মনমোহন সিংয়ের আমলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ আরও শক্তিশালী হয়েছিল বলেও দাবি করেন সোনিয়া। তথ্যের অধিকার আইন বা আরটিআই-এর মাধ্যমে সরকারি কাজকর্মে স্বচ্ছতা বাড়ানো হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমানে আরটিআইয়ের ক্ষমতা অনেকটাই খর্ব করা হয়েছে।
তাঁর আরও দাবি, মনমোহন সিংয়ের আমলে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিকাশ ঘটেছিল এবং নাগরিক সমাজও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছিল। সেই সময় ছাত্ররা সরকারের এমনকী প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করতে পারতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোনিয়া আরও বলেন, ড. মনমোহন সিং সংসদের কাছে নিজেকে নিয়মিত জবাবদিহির মধ্যে রাখতেন এবং ১০০টিরও বেশি পূর্বনির্ধারিত নয় এমন সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের কাছেও জবাবদিহি করতেন।
ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সোনিয়ার মতে, কয়েক দশকের পরমাণু ক্ষেত্রে বৈষম্য ও নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটিয়ে ওই চুক্তি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল। তাঁর দাবি, ড. সিংয়ের রাজনৈতিক সাহস ও ধারাবাহিক উদ্যোগের কারণেই এই চুক্তি সম্ভব হয় এবং এর সুফল এখনও পাওয়া যাচ্ছে।
সোনিয়া বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ড. মনমোহন সিং যথেষ্ট সম্মান ও প্রশংসা পেয়েছিলেন। কিন্তু নিজের সাফল্য বা প্রাপ্ত সম্মান নিয়ে তিনি কখনও প্রচার চালানোর প্রয়োজন অনুভব করেননি। ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতি তাঁর বিশ্বাস, শেষ নাগরিক পর্যন্ত ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছা এবং গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর আস্থা তাঁর সরকারের দর্শনের ভিত্তি ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোনিয়ার মতে, বর্তমানের সংঘাতপূর্ণ সময়ে ড. মনমোহন সিংয়ের রাষ্ট্রনায়কোচিত মানসিকতা, পাণ্ডিত্য এবং মৌলিক সৌজন্যবোধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাঁর সততা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলি ফাঁপা প্রমাণিত হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়কাল ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পর্ব হিসেবে ক্রমশ স্বীকৃতি পাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শেষে সোনিয়া গান্ধী বলেন, ড. মনমোহন সিং আজ বেঁচে থাকলে এই দিনটি দেখতে এবং তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে দেশকে পথ দেখাতে পারতেন—এটাই তাঁদের আক্ষেপ। তবে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ড. সিং যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোনিয়ার কথায়, “ইতিহাস তাঁকে নিঃসন্দেহে সদয়ভাবেই মনে রাখবে—একজন শান্ত, বিনয়ী, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।”
–আইএএনএস



















