নয়াদিল্লি, ৯ আগস্ট (আইএএনএস): প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আম আদমি পার্টি (আপ) সরকারের আমলে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে বলে দাবি করলেন দিল্লির পূর্তমন্ত্রী পারভেজ সাহিব সিং। রবিবার তিনি জানান, ৭ আগস্ট প্রকাশিত কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)-এর রিপোর্টে ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
কেজরিওয়াল সরকারের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রবেশ সাহিব সিং বলেন, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ১,১৮৫টি ম্যানুয়াল টেন্ডার করেছিলেন এবং টেন্ডারে আরবিট্রেশন ক্লজ যুক্ত করে বড় আকারের অনিয়ম করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির পাশাপাশি চুক্তি প্রদানের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ নথিও নষ্ট বা গায়েব করা হয়েছিল।
দিল্লি বিজেপির রাজ্য দফতরে সাংবাদিক বৈঠকে পূর্তমন্ত্রী বলেন, ক্যাগের রিপোর্টই প্রাক্তন কেজরিওয়াল সরকারের দুর্নীতির লিখিত প্রমাণ। তাঁর দাবি, কেজরিওয়াল সরকারের আমলে নিয়মিত অডিট করা হয়নি।
তিনি জানান, বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বাধীন দিল্লি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে ২৪টি ক্যাগ রিপোর্ট পেয়েছে এবং প্রতিটি রিপোর্টেই হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে।
সাংবাদিক বৈঠকটি পরিচালনা করেন দিল্লি বিজেপির মিডিয়া প্রধান প্রবীণ শঙ্কর কাপুর। উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র ইয়াসির জিলানি।
পারভেজ সাহিব সিং বলেন, দু’দিন আগে দিল্লি বিধানসভায় পেশ হওয়া ক্যাগ রিপোর্টে প্রাক্তন কেজরিওয়াল সরকারের আমলে বিভিন্ন অর্থবর্ষে সংঘটিত কথিত অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।
রিপোর্টের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিল্লির কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ৭০,৪১০ কোটি টাকা কর বাবদ বকেয়া ছিল। কিন্তু আগের দিল্লি সরকার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই অর্থ আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিভিন্ন দফতরেও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন পূর্তমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিদ্যুৎ ভর্তুকি প্রকল্পে প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহকের টানা ১২ মাস বিদ্যুৎ বিল শূন্য থাকা সত্ত্বেও তাঁদের ১৭.৮১ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারি কোষাগারের ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৯০ হাজার গ্রাহক ছয় থেকে ১১ মাস নিজেদের বাড়িতে ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তাঁদের ১১.৮৮ কোটি টাকার বিদ্যুৎ ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের ঘটনায় মোট ৪২ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে বিদ্যুৎ ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে তিনি জানান, বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
এলএনজেপি হাসপাতাল নির্মাণেও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন প্রবেশ সাহিব সিং। তাঁর দাবি, কেজরিওয়াল সরকারের সময় হাসপাতাল নির্মাণ শুরু হলে প্রতি বেডের জন্য প্রাথমিক ব্যয় প্রায় ৩৩ লক্ষ টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন বারবার নির্মাণস্থল পরিদর্শনের পর সেই খরচ বেড়ে প্রতি বেডে ৭২ লক্ষ টাকা হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পূর্তমন্ত্রী বলেন, টেন্ডার অনলাইনে করা বাধ্যতামূলক হলেও প্রাক্তন কেজরিওয়াল সরকার ১,১৮৫টি ম্যানুয়াল টেন্ডার করেছিল। এসব টেন্ডারে মোট ১৪,৫২৭টি বিড জমা পড়ে। তাঁর অভিযোগ, দরদাতাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে আগে থেকেই নির্ধারিত পদ্ধতিতে দর ঠিক করা হয়েছিল।
চুক্তি প্রদানের নথি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, মাত্র ৩ শতাংশ টেন্ডারের ক্ষেত্রে চুক্তি প্রদানের নথি পাওয়া গিয়েছে। বাকি ৯৭ শতাংশ চুক্তির নথি দিল্লি সরকারের কাছে নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পারভেজ সাহিব সিং বলেন, এই কারণেই অরবিন্দ কেজরিওয়াল অডিট হতে দেননি এবং নিজে ফাইলে স্বাক্ষর করতেন না বলে তাঁর অভিযোগ। তাঁর দাবি, এর ফলে তাঁর সরকারের মন্ত্রীরা জেলে গেলেও কেজরিওয়াল নিজে বাইরে ছিলেন।
জিএসটি নিয়েও ক্যাগ রিপোর্টের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৮,৩৩৪টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জিএসটি রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে গেলেও সেগুলি থেকে ই-ওয়ে বিল তৈরি হতে থাকে।
২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়কে অন্তর্ভুক্ত করা ক্যাগ রিপোর্টে প্রায় ৬৮,৬৮০ কোটি টাকার ভুয়ো ই-ওয়ে বিল তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এছাড়াও ৪,০৭৬ জন জিএসটি রিটার্ন দাখিল না করা করদাতা ই-ওয়ে বিল তৈরি করে যাচ্ছিলেন। তাঁদের তৈরি ই-ওয়ে বিলের মূল্য ছিল প্রায় ১১,৬৩৫ কোটি টাকা। এসব ঘটনাও প্রাক্তন কেজরিওয়াল সরকারের সঙ্গে যোগসাজশে ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন পূর্তমন্ত্রী।
তিনি আরও জানান, মোট ৬.১০ কোটি ই-ওয়ে বিলের মধ্যে মাত্র ০.১০ শতাংশ পরীক্ষা করা হয়েছিল। কয়েকটি ঘটনার তদন্তে ৩৪৪টি নিয়ম না মানার ঘটনা ধরা পড়েছে, যার সঙ্গে ৩,০৭১.৯২ কোটি টাকার রাজস্ব প্রভাব জড়িত। পাশাপাশি ৩,৭১০.১৭ কোটি টাকার টার্নওভার সংক্রান্ত অসঙ্গতিও ধরা পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
—আইএএনএস



















