জয়পুর, ১ অগস্ট (আইএএনএস): পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর সংস্কৃতি ভারতের সভ্যতা, বেদ, প্রাচীন ইতিহাস এবং কৌটিল্য থেকে মহাত্মা গান্ধীর দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত বলে মন্তব্য করলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি (সিজেআই) বিচারপতি সূর্য কান্ত। শনিবার জয়পুরে কমনওয়েলথ মধ্যস্থতা সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, মধ্যস্থতা আইন, ২০২৩ কার্যকর হওয়ার বহু আগে থেকেই এই পদ্ধতি ভারতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মধ্যস্থতা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে আইনসভা এবং বিচারব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
মধ্যস্থতার গুরুত্ব বোঝাতে প্রধান বিচারপতি দুই বোনের একটি গল্প তুলে ধরেন। একটি কমলালেবুর মালিকানা নিয়ে দুই বোনের মধ্যে বিরোধ হয়। বড় বোন জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এবং ছোট বোন বয়সে ছোট হওয়ার কারণে ফলটির দাবিদার বলে দাবি করে। শেষ পর্যন্ত তারা ফলটি সমান ভাগে ভাগ করে নেয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, একজন শুধু ফলের শাঁস খেয়ে খোসা ফেলে দেয়, আর অন্যজন শাঁস ফেলে দিয়ে খোসা দিয়ে কেক তৈরি করে।
এই উদাহরণ টেনে সিজেআই বলেন, যদি দুই বোন নিজেদের প্রকৃত প্রয়োজন নিয়ে আগে আলোচনা করত, তাহলে একজন পুরো শাঁস এবং অন্যজন পুরো খোসাই পেতে পারত। বাস্তব জীবনেও মধ্যস্থতার অভাবে অনেক সময় আলোচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তিনি বলেন, রামায়ণ, মহাভারতসহ ভারতের প্রাচীন গ্রন্থগুলিতেও মধ্যস্থতার নানা দিকের উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে শাসনব্যবস্থার চারটি নীতি—‘সাম’ (সমঝোতা), ‘দাম’ (প্রলোভন), ‘দণ্ড’ (শাস্তি) এবং ‘ভেদ’ (বিভাজন)—উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘সাম’ বা সমঝোতাকে প্রথম স্থানে রাখা হয়েছে, যা আধুনিক মধ্যস্থতা ব্যবস্থার মূল ভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, প্রাচীন ভারতে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি সুসংগঠিত ধারা ছিল। প্রথমে পরিবারের (কুল), পরে গোষ্ঠী বা শ্রেণী, এরপর পুগ বা বৃহত্তর সমাবেশে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হতো। সবশেষে বিষয়টি রাজার কাছে নিয়ে যাওয়া হতো। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানই ছিল প্রথম পছন্দ।
মহাত্মা গান্ধীর আইনজীবী জীবনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, গান্ধীজি নিজেই লিখেছিলেন যে, দুই পক্ষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সমঝোতা করিয়ে দেওয়াই তাঁর আইনজীবী জীবনের সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক অভিজ্ঞতা ছিল।
তিনি বলেন, “এতেই প্রমাণিত হয় যে, ২০২৩ সালে আইন প্রণয়নের বহু আগেই মধ্যস্থতা ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বর্তমানে আইনসভা ও বিচারব্যবস্থা যৌথভাবে এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করছে।”



















