জিন্দ (হরিয়ানা), ১৭ জুলাই (আইএএনএস): ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের কারণে হরিয়ানার জিন্দ ‘সুশাসনের মডেল’ হয়ে উঠেছে বলে দাবি করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুক্রবার জিন্দ থেকে দেশের প্রথম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেনের উদ্বোধন করে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের আগে যদি উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হত, তাহলে ভারতীয় রেলওয়ে কার্যত অচল হয়ে পড়ত, কারণ সেই সময় রেলের বড় অংশ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
দেশের প্রথম ১০ কোচের হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন ‘নমো গ্রিন রেল’-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথম পর্যায়ে এই ট্রেন হরিয়ানার জিন্দ থেকে রাজধানী সংলগ্ন সোনিপত পর্যন্ত চলবে। পাশাপাশি প্রায় ১৪,৭০০ কোটি টাকার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পেরও উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। এই প্রকল্পগুলি যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই প্রকল্পগুলি মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সহজ করবে এবং হরিয়ানার উন্নয়নের গতি বাড়াবে।”
হাইড্রোজেন ট্রেন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছে এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের একটি সফল উদাহরণ। তাঁর দাবি, দেশের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন “বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দীর্ঘতম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেনগুলির মধ্যে অন্যতম।” তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বের মাত্র তিন-চারটি দেশের এই ধরনের ট্রেন চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
ভারতীয় রেলের আধুনিকীকরণের পথে এই পদক্ষেপকে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে যখনই হাইড্রোজেন ট্রেনের কথা উঠবে, তখন জিন্দ, সোনিপত এবং হরিয়ানার নামও স্মরণ করা হবে।
শূন্য কার্বন নির্গমনকারী এই ট্রেনটি জিন্দ থেকে সোনিপত পর্যন্ত প্রায় ৮৯ কিলোমিটার পথ দুই ঘণ্টায় অতিক্রম করবে এবং পথে ১২টি স্টেশনে থামবে। এর মাধ্যমে হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন পরিচালনাকারী নির্বাচিত দেশগুলির তালিকায় ভারত যুক্ত হল।
হরিয়ানাকে ইতিহাস, সাহস, বিশ্বাস ও গৌরবের ভূমি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই রাজ্যে এলে তাঁর হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে।
উপসাগরীয় অঞ্চল এবং হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ আমদানির ওপর এর প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতি যদি ২০১৪ সালের আগে তৈরি হত, তাহলে আমাদের রেল ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যেত।” তাঁর মতে, সেই সময় ভারতীয় রেলের বড় অংশ ডিজেলচালিত ছিল।
হরিয়ানভি পাগড়ি পরে অনুষ্ঠানে আসা প্রধানমন্ত্রী পুরনো স্মৃতিচারণ করে বলেন, “জিন্দের ঘি এবং ঘেওয়ারের স্বাদ বছরের পর বছর একই রয়েছে, কিন্তু জিন্দের মানুষের চিন্তাভাবনা ও জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তন এসেছে। কয়েক দশক আগে সাংগঠনিক কাজে প্রথম জিন্দে এসেছিলাম। তখন আপনারা যে ভালোবাসা ও উষ্ণতা দিয়েছিলেন, তা আমি কখনও ভুলিনি।”
তিনি বলেন, “আজ জিন্দ বিজেপি-এনডিএ সরকারের সুশাসনের মডেলের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। গত কয়েক বছরে গোটা হরিয়ানা উন্নয়নের নতুন পথে এগিয়েছে। আজকের অনুষ্ঠান ডাবল ইঞ্জিন সরকারের এই উন্নয়ন অভিযানে নতুন গতি দিচ্ছে।”
অনুষ্ঠানে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব, হরিয়ানার রাজ্যপাল আশিম কুমার ঘোষ এবং মুখ্যমন্ত্রী নায়ব সিং সাইনি উপস্থিত ছিলেন।
রেলমন্ত্রী বৈষ্ণব বলেন, “আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। দেশের নেতৃত্বে ভারত হাইড্রোজেন প্রযুক্তি উন্নয়নে বড় প্রযুক্তিগত সাফল্য অর্জন করেছে।”
প্রধানমন্ত্রী ও ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রশংসা করে তিনি জানান, সোনিপতের পরবর্তী অংশেও ট্রেনটির পরীক্ষা চলছে এবং ভবিষ্যতে জিন্দ থেকে দিল্লি পর্যন্ত এই হাইড্রোজেন ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
হাইড্রোজেন ট্রেন উদ্বোধনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী একাধিক বড় পরিকাঠামো প্রকল্প জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন এবং কয়েকটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৯,৬৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১৫৭.৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত দিল্লি-অমৃতসর-কাটরা এক্সপ্রেসওয়ের অংশ। ৬৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ে দিল্লি থেকে কাটরার যাত্রার সময় প্রায় ১৪ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ছয় ঘণ্টায় এবং দিল্লি-অমৃতসর যাত্রা প্রায় আট ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টায় নামিয়ে আনবে।
এই প্রকল্পের ফলে জাতীয় সড়ক-৪৪-এর যানজট কমবে, তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের যাতায়াত বাড়বে এবং শিল্প ও লজিস্টিক উন্নয়নে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী ৩৩.৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের আংশিক নিয়ন্ত্রিত আম্বালা-কালা আম্ব হাইওয়ে এবং ৪০.৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ জিন্দ-গোহানা গ্রিনফিল্ড হাইওয়েও জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। জিন্দ-গোহানা হাইওয়ে চালু হলে দুই শহরের যাত্রার সময় প্রায় দুই ঘণ্টা থেকে কমে ৪০ মিনিট হবে।
এছাড়া ২৪.২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হাসি-বারওয়ালা ব্রাউনফিল্ড হাইওয়ে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
কুরুক্ষেত্রে এলিভেটেড রেল ট্র্যাক প্রকল্পও জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে শহরের দীর্ঘদিনের রেল ক্রসিং সংক্রান্ত যানজট কমবে এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ আরও উন্নত হবে।
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ভিওয়ানি জেলার পণ্ডিত নেকি রাম শর্মা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ, নারনৌলের কোরিয়াওয়াসে মহর্ষি চ্যবন মেডিক্যাল কলেজ এবং রাও তুলা রাম হাসপাতাল জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলি হরিয়ানায় চিকিৎসা শিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।
কুরুক্ষেত্রে শিখ জাদুঘরের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই জাদুঘরে শিখ ধর্মের ইতিহাস, গুরুদের শিক্ষা, তাঁদের আত্মত্যাগ এবং ভারতের সংস্কৃতিতে শিখ সম্প্রদায়ের অবদান তুলে ধরা হবে।
………
























