নয়াদিল্লি, ১৩ জুলাই (আইএএনএস): দলিত ছাত্র নিতিন রাজের আত্মহত্যা মামলায় অভিযুক্ত কান্নুর ডেন্টাল কলেজের অধ্যাপক ড. এম. কোডান্ডা রামকে আগাম জামিন দিতে অস্বীকার করল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে, “একটি বার্তা যেতেই হবে যে শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে এই ধরনের আচরণ করতে পারেন না।”
বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ সোমবার ড. রামের দায়ের করা বিশেষ অনুমতি আবেদন।
খারিজ করে দেয়। কেরল হাইকোর্ট তাঁর গ্রেফতার-পূর্ব সুরক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন ওই অধ্যাপক।
শুনানিতে ড. রামের পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী ডি. এস. নাইডু। তিনি দাবি করেন, শ্রেণিকক্ষে অপমানের যে অভিযোগ উঠেছে, তা ছাত্রের মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে ঘটেছিল। তাই সেটিকে আত্মহত্যার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে ধরা যায় না।
নাইডুর দাবি, নিতিন রাজের মৃত্যুর প্রায় এক ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, নিতিন একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ নিয়েছিলেন এবং অনুমতি ছাড়াই একজন অধ্যাপকের নাম গ্যারান্টার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। পরে ঋণ আদায়কারী সংস্থার অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে অধ্যক্ষের কক্ষে তিরস্কার করা হয়েছিল।
ড. রামের বিরুদ্ধে কোনও জাতিগত মন্তব্যের অভিযোগ নেই বলেও দাবি করেন তাঁর আইনজীবী। তিনি বলেন, ছাত্রদের শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে গিয়ে শিক্ষকরা কঠোর হলে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হলে শিক্ষকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইনজীবী বলেন, “তিনি একটি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক। ছাত্রের স্বার্থে কখনও কখনও একজন শিক্ষক কঠোর বা প্রভাবশালী আচরণ করতে পারেন।”
এই বক্তব্যের পর বিচারপতি বিক্রম নাথের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ অধ্যাপকের কথিত আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালত মন্তব্য করে, “অমানবিক—এই শব্দটিই মনে আসে। তিনি ছাত্রদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতেন?”
সুপ্রিম কোর্ট আরও জানায়, শ্রেণিকক্ষে প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়ার ফলে একজন ছাত্রের মানসিক অবস্থার ওপর যে গভীর প্রভাব পড়তে পারে, তা উপেক্ষা করা যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, “তাঁকে নিজের কাজের পরিণতি বুঝতে হবে। যদি একজন ছাত্রকে এভাবে অপমান করা হয়, তার প্রভাব কী হতে পারে? সেটিই হয়তো শেষ ধাক্কা ছিল।”
অভিযুক্ত অধ্যাপক নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন— আইনজীবীর এই বক্তব্যের জবাবে আদালত জানায়, “শিক্ষা নেওয়ার প্রশ্ন নয়।” এরপর বেঞ্চ মন্তব্য করে, “এই ধরনের আচরণ করে কোনও শিক্ষক পার পেয়ে যেতে পারেন না। একটি বার্তা যেতেই হবে।”
এরপরই কেরল হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা ড. রামের আবেদন খারিজ করে দেয় শীর্ষ আদালত।
উল্লেখ্য, কান্নুর ডেন্টাল কলেজের ছাত্র নিতিন রাজ গত ১০ এপ্রিল কলেজের কাছের একটি ভবন থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগ। তাঁর বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ড. রাম এবং আরও দুই শিক্ষক সদস্যের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা এবং তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি (নির্যাতন প্রতিরোধ) আইন-এর ধারায় মামলা দায়ের করে।
অভিযোগ ছিল, মৃত্যুর আগে নিতিন রাজ জাতিগত হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
গত ১৯ জুন কেরল হাইকোর্ট ড. রামের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে। হাইকোর্টে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ছাত্রদের বক্তব্যে অধ্যাপকের অনুপযুক্ত আচরণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং তিনি অন্য শিক্ষকদেরও নিতিন রাজকে হয়রানি করতে উৎসাহিত করেছিলেন।
কেরল সরকারও ওই অধ্যাপকের গ্রেফতার-পূর্ব সুরক্ষার বিরোধিতা করেছিল। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা পক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ এবং ছাত্রের কথিত ঋণ সংক্রান্ত নথি দেখিয়ে দাবি করেছিল, আত্মহত্যার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে।
কেরল হাইকোর্টের বিচারপতি এ. বদরুদ্দিন মেডিক্যাল কলেজগুলিতে বারবার ওঠা হয়রানির অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এ ধরনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা সুপারিশ করতে একটি কমিটি গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।



















