নয়াদিল্লি, ২৭ জুন (আইএএনএস): গাজা সংঘাত নিয়ে কেন্দ্রের অবস্থানকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী। শনিবার প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধে তিনি অভিযোগ করেন, গাজা ইস্যুতে মোদি সরকারের ‘পাথরের মতো নীরবতা’ এবং ‘নিষ্ক্রিয়তা’ শুধু নৈতিক দিক থেকেই প্রশ্নের মুখে নয়, জাতীয় স্বার্থের নিরিখেও তা ব্যাখ্যাতীত।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত ওই নিবন্ধে সোনিয়া দাবি করেন, ভারতের বর্তমান অবস্থান দেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্য থেকে সরে এসেছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ভাবমূর্তিকে দুর্বল করেছে।
তিনি লেখেন, ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ানো ভারতের জাতীয় চেতনার দাবি। একইসঙ্গে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যে জনমত তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে ভারতেরও প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত ছিল। তাঁর অভিযোগ, মোদি সরকারের দীর্ঘ নীরবতার কোনও নৈতিক বা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই।
সোনিয়া গান্ধী তাঁর নিবন্ধে রাষ্ট্রসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড সংক্রান্ত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কমিশন গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তোলে। পরে ২০২৬ সালের জুনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এস. মুরলীধরের নেতৃত্বাধীন একই কমিশন জানায়, শিশুদের লক্ষ্য করে হামলাসহ গাজায় ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই ইজরায়েলি অভিযান চালানো হয়েছে।
তিনি লেখেন, ৯৪ পাতার ওই প্রতিবেদনে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তাঁর দাবি, অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত হয়েছে এবং আরও ৪৪ হাজার শিশু আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই আজীবনের জন্য পঙ্গুত্বের শিকার।
সোনিয়া আরও অভিযোগ করেন, শিশু হাসপাতাল-সহ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ধ্বংসের ফলে গর্ভপাত এবং প্রসবজনিত জটিলতা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।
তবে তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইজরায়েলে হামলাকে ‘জঘন্য, ভয়াবহ এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলেও উল্লেখ করেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, এরপর গত আড়াই বছরে ইজরায়েলের সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল ‘নির্বিচার নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতায়’ ভরা।
নিবন্ধে তিনি আরও দাবি করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসনের সমর্থন ইজরায়েলকে এই সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন বাধার কারণে রাষ্ট্রসংঘও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
সোনিয়া গান্ধীর দাবি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া-সহ একাধিক দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইজরায়েলে অস্ত্র রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশ ইজরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কমিয়েছে বা ছিন্ন করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ভারতের ঐতিহ্যবাহী পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেস নেত্রী বলেন, একসময় ভারত উপনিবেশ-উত্তর সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক শান্তির পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে ভারতের নীরবতা সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভারত তার ঐতিহাসিক মিত্র ফিলিস্তিন, ইরান এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলির থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দাবি করার সুযোগ করে দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নিবন্ধের শেষে সোনিয়া গান্ধী দাবি করেন, ভারতের ঐতিহ্যবাহী পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে আসার ফলে দেশের বিশেষ কোনও কূটনৈতিক লাভ হয়নি; বরং তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-র ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
সূত্র: আইএএনএস























