নিউইয়র্ক, ২৩ জুন (আইএএনএস): বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) বিল, ২০২৬ সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে অন্তত ১৩টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান রূপে বিলটি কার্যকর হলে মানবাধিকার কমিশন কার্যত একটি “প্রতীকী প্রতিষ্ঠান”-এ পরিণত হবে, যার কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও স্বাধীনতা থাকবে না।
এক যৌথ বিবৃতিতে সংস্থাগুলি বলেছে, বাংলাদেশ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে বিলটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠনের নিশ্চয়তা দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এটি এমন একটি সময়, যখন বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নাগরিক পরিসরে বিধিনিষেধ এবং মানবাধিকার কর্মীদের ওপর আক্রমণের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যার মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থার প্রয়োজন। কিন্তু প্রস্তাবিত বিলটি সেই লক্ষ্য থেকে বিপরীত দিকে এগোচ্ছে।”
সংস্থাগুলির মতে, বর্তমান রূপে বিলটি পাস হলে মানবাধিকার কমিশন কেবলমাত্র একটি নামমাত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যার ক্ষমতা সীমিত থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সক্ষমতাও কমে যাবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, কমিশনের সদস্য নির্বাচন কমিটির কাঠামোতে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংস্থাগুলি উল্লেখ করেছে যে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে নির্বাচন কমিটিতে গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিসহ স্বাধীন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও নতুন বিলে সেই ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-সহ শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে।
তাদের মতে, এতে গুরুতর স্বার্থের সংঘাত তৈরি হবে, কারণ সরকারের কর্মকাণ্ড তদন্তের দায়িত্ব যাঁদের ওপর থাকবে, তাঁদের নিয়োগে সরকারই প্রধান ভূমিকা পালন করবে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলি বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বিলটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলির একটি হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা।
তাদের বক্তব্য, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সঙ্গে প্রায়ই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নাম উঠে এসেছে। অথচ প্রস্তাবিত বিলে এমন একটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে কার্যত ওই সংস্থাগুলিকেই নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করার সুযোগ দেওয়া হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উচিত রাষ্ট্রের সব স্তরের কর্মকাণ্ড তদন্ত করার ক্ষমতা থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করা।
কিন্তু প্রস্তাবিত এনএইচআরসি বিল, ২০২৬ এই মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি সংস্থাগুলির।
তারা সতর্ক করে বলেছে, “যথাযথ সংশোধন না করা হলে এই বিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে, যা দেখতে মানবাধিকার কমিশনের মতো হলেও তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও স্বাধীনতা থাকবে না।”
সংস্থাগুলি বাংলাদেশ সরকারের কাছে কমিশনের প্রশাসনিক, নিয়ন্ত্রক এবং আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।
এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য-সহ সকল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থাও গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি কমিশনে নারী, জাতিগত সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থবহ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার রক্ষাকারী কর্মীদের সুরক্ষা ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কাজ করার কমিশনের ক্ষমতা পুনর্বহালের দাবিও জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি।



















